‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২০, ২১:৫৭

রীমা রানী সাহা

 

করোনা সংকটের মধ্যে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। দেশের পশ্চিমাঞ্চল পুরোপুরিভাবে এখনো সেই ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এরই মধ্যে উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে একযোগে বন্যা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে বন্যার কারণ মূলত দুটি—উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টি। ভারতের পূর্বাঞ্চল বা উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এবং অব্যাহত বৃষ্টির কারণে ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও মেঘনা অববাহিকার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। ইতিমধ্যে কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, জামালপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার বিভিন্ন এলাকা বন্যাকবলিত হয়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে প্রতিদিন।

বন্যা এমন একটা সময় দেখা দিল যখন মাঠে আমনের বীজতলা, আখ, ভুট্টা, পাট ও গ্রীষ্মকালীন সবজি। বন্যাকবলিত এলাকায় বহু বাড়িঘর বন্যার তোড়ে ভেসে গেছে। তলিয়ে গেছে পুকুর, ফসল। বহু মানুষ গবাদিপশু নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। নদীতীরবর্তী শত শত ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুম এলেই অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হবে—ফসলহানি ঘটবে, নদীভাঙন হবে, বাস্তুচ্যুত ঘটবে; এ যেন যস্মিন দেশে যদাচার! গত বছরের তুলনায় বন্যা এবার বেশ আগেই হাজির হয়েছে। তিস্তার পানি নিয়মিতভাবেই বাড়ছে। যে তিস্তা নদী বছরের বেশিরভাগ সময় পানির অভাবে হাহাকার করে, সেই তিস্তার ভাঙনে এখন সব হারানোর আতঙ্কে ভুগছে হাজার হাজার মানুষ।

বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ। হিমালয় থেকে আসা জলের সঙ্গে পলি এসে এদেশের অনেক এলাকা গড়ে উঠেছে। হিমালয় থেকে আসা বরফগলা পানি ও অতিবৃষ্টির পানি বিভিন্ন প্লাবনভূমি ও নদ-নদী দিয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে যায়, তার ৯০ ভাগের বেশি আসে উজান থেকে। ভৌগোলিক বাস্তবতায় বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানোর সুযোগ খুব একটা নেই বললেই চলে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিবছর সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় টেকসই ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে খুব কমই দেখা যায়। বৃষ্টির পানি জমার ক্ষেত্রগুলো হলো খাল-বিল, নদী-নালাসহ বিভিন্ন জলাশয়। দুঃখের বিষয়—অধিকাংশ নদনদী, খাল-বিল ভরাট হয়ে গেছে। অগভীর জলাশয়গুলো পানি ধারণ ক্ষমতা হারিয়েছে। নদ-নদীগুলোর পরিকল্পিত ড্রেজিং বন্যা মোকাবিলা ও ভাঙন রোধে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। নদী ভরাটের কারণে প্রতিবছর দেখা দিচ্ছে বন্যা, বাড়ছে নদীভাঙন। বন্যার সময় টেকসই বাঁধ নদী তীরবর্তী মানুষের বড়ো সহায়। ভেঙে যাওয়া নদীতীর রক্ষা বাঁধগুলোর সংস্কার ও স্থায়ীভাবে মেরামত না করায় বড়ো খেসারত দিতে হচ্ছে নদীতীরের বাসিন্দাদের।

প্রাকৃতিক বিষয়গুলো মোটামুটি নির্ধারিতই বলা চলে! কিন্তু তাই বলে প্রতিবছর একই পরিণতি ভোগ করতে হবে? বন্যা মোকাবিলায় টেকসই ব্যবস্থা ও আগাম প্রস্তুতির কথা বিবেচনায় রাখা জরুরি। নদ-নদীসহ সব ধরনের জলাশয়ে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে পরিকল্পিত ড্রেজিং ও বাঁধ সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। করোনাকালে এমনিতেই গরিব ও অভাবী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এ সময় বন্যা ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। বন্যা উপদ্রুত এলাকার অধিবাসীদের জন্য এখনই বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। সুষ্ঠুভাবে ত্রাণ বিতরণ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের বিকল্প কিছু নেই। পর্যাপ্ত খাবার, ওষুধ ও চিকিত্সাসেবা প্রস্তুত রাখতে হবে। বন্যা পরবর্তী সময়ে কৃষক ও গরিবদের সহায়তায় বিশেষ ব্যবস্থাও।

দিনাজপুর