করোনা মহামারীতে ব্যাংকারদের বেতন কমানো: একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২০, ২০:২৮

কোভিড-১৯ এর কারণে বিশ্বব্যপী নজিরবিহীন অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই এ ক্ষতির সম্মুখীন। আর এ অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠার জন্য সরকার নানা কৌশলী কর্মকান্ড হাতে নিয়ে এগুচ্ছে। করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রায় লক্ষাধিক কোটি টাকার প্রানোদণার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

এ প্রানোদণা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য করোনার প্রভাবে ঝিমিয়ে পড়া ছোট বড় মাঝাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সচল করে দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জিবীত করা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে করোনা সংকট মোকাবেলায় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনীর সাথে সাথে দেশের ব্যাংক কর্মীরা অর্থনৈতিক গতিশীলতা ধরে রাখার জন্য সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসাবে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে জীবনের ঝুকি নিয়ে। প্রায় লক্ষাধিক কোটি টাকায় প্রনোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়নের মূল কান্ডরীরা এই হলো ব্যাংক কর্মীরা। কেননা এ প্রনোদণা কর্মসূচি ব্যাংকের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে কার্যরত ব্যাংকের সংখ্যা ৬২ টি, তন্মোধ্যে বেসরকারী ব্যাংকের সংখ্যা ৪২ টি।

সম্মুখসারির করোনা যোদ্ধা হিসেবে সরকারি বেসরকারি ব্যাংকের সকল কর্মকর্তা কর্মচারীরা করোনাকালীন সময়ে জীবন বাজি রেখে জনগনকে যখন নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই বেসরকারি ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকারস (বিএবি) এর একটি চিঠি বেসরকারি ব্যাংক কর্মীদের আতঙ্কিত করে তুলেছে।

বিএবি ওই চিঠিতে ব্যাংকারদের নান সুবিধা বন্ধের পাশাপাশি ৪০ হাজার টাকার বেশি বেতনধারীদের ১৫ শতাংশ করে বেতন কমানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিএবির চিঠিতে কর্মীদের পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি, প্রণোদনা বোনাস বন্ধ রাখার সুপারিশ করেছে।  ইতিমধ্যে বেসরকারি তিনটি ব্যাংক এবি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক বেতন কমানোর হঠকারী সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। ৪২ টি বেসরকারি ব্যাংকে প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার কর্মী রয়েছে। করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ায়িত্বে নিয়োজিত ব্যাংক কর্মীরে বেতন হ্রাসের ফলে অর্থনীতি মন্দ ছাড়া ভাল হবে না। কারন বেতন কমে গেলেই হঠাৎ করে ঐ ব্যক্তির পক্ষে  তার জীবন ধারার ব্যয় কমানো সম্ভব নয়। ফলে কমে যাবে তাদের কর্মস্পৃহা।

আমরা সবাই জানি বেসরকারি প্রায় সকল ব্যাংকই বছরের পর বছর শত শত কোটি টাকা মুনাফা করে আসছে। কোভিড সংকট কালীন সময়ে ব্যাংক ব্যবসাতেও  নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষত গত এপ্রিল থেকে নয় ছয় সুদের হার বেধে দেওয়ায় তাদের মুনাফা এ বছরে বাস্তবেই কম হবে।  কোভিট মাহমারীর কারণে এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। বেতন কাটছাট না করলেও তাদের মুনাফা হয়ত কিছুটা কম হবে। তবে সম্প্রতি গণমাধ্যমের এক সংবাদ থেকে জানা যায় যে, বেসরকারি সিটি ব্যাংক তাদের কর্মীদের ১৬ শতাংশ বেতন-ভাতা কমিয়ে দিয়েছে।

তাতে তাদের খরচ বাঁচবে ১০০ কোটি টাকার মতো। ব্যাংকটি গত ২০১৯ সালেও ৮৪০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। যাতে বুঝা যায় ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি মজবুত। যা প্রমান করে ব্যাংকটি কর্মীদের বেতন না কমালেও তারা মুনাফা করতে পারবে। বিএবির পরামর্শ আমাদের মনে হয় মাথা ব্যথার জন্য যেন মাথাই কেটে ফেলতে হবে। ব্যাংক কর্মীদের বর্তমানে চলমান বেতন-ভাতা না কমিয়ে ব্যাংকের বাহুল্য খরচ কমিয়ে তাদের ব্যয় সমন্বয় করতে হবে। যেমন ব্যাংকে সাজসজ্জার ব্যয় বহুল খরচ কমানো, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী সেন্সর যুক্ত বাল্ব লাগানো, যাতে বিদ্যুৎ খরচ কম হয়।

শীতলীকরণ যন্ত্রের কম ব্যবহার, যথাসম্ভব কাগজবীহিন যোগাযোগ করা, যাতে ব্যাংকের স্টেশনারী ব্যয় কম হয়। আগামী বছরের জন্য নতুন শাখা এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা বন্ধ রাখা, কর্মীরে সব বিদেশ ভ্রমন বন্ধ রাখা, পত্রিকা ও টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখা এবং এর পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাংকের প্রচার চালানো। সামাজিক দায়য়বদ্ধতা খরচ ও অনুান বন্ধ রাখা। ব্যবস্থাপক সম্মেলন ও নির্বাহীদের সভা ব্যয় বহুল হোটেলে না করে প্রযুক্তির মাধ্যমে করা, যাতে হোটেলের খরচ, কর্মীদের আপ্যায়ন খরচ ও দৈনন্দিন ভাতা বাবদ অর্থ সাশ্রয় হবে। আইটি সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার ক্রয় যথা সম্ভব সীমিত রাখা। খুব বেশি হলে তাদের প্রনোদণা ভাতা প্রদান বন্ধ রাখা। আর একান্তই যদি বেতন ভাতা কমাতেই হয় তবে সহকারী মহাব্যবস্থাপক ও তদুর্ধ উচ্চ নির্বাহীদের বেতন ভাতা কমানো যেতে পারে। ব্যাংকের প্রধান ব্যয় হয় আমানত কারীদের সুদ ব্যয়ে যা এতদিন বাজার অর্থনীতির উপর চালু ছিল।

সম্প্রতি সরকারি সিদ্ধান্তে গত এপ্রিল থেকে ঋনের সুদ সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ আমানতের সুদের হার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ বেধে দিয়েছে। মূলত এ কারনেই ব্যাংকের আয় কমে যাবে। এ জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় অর্থ মন্ত্রীর কাছে অনুরোধ নয় ছয়ের সিদ্ধান্ত পূনর্বিবেচনা করুন। অন্তত আগামী এই বছরের জন্য ও স্থগিত করে ঋণ ও আমানতের সুরে হার বাজারের উপর ছেড়ে দিন। তাতে অর্থনীতির চালিকা শক্তি ব্যাংক খাত শক্তিশালী হবে।

সর্বোপরি ব্যাংক খাতের উদ্যোক্তাদের প্রতি অনুরোধ আপনারা হলেন দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড।আপনারা ব্যাংকের মাধ্যমে হাজার হাজার কর্মসৃজন করেছেন। তাই আপনারা আপনাদের ব্যাংকের কর্মীদের ছাটাই করবেন না এবং চলমান বেতন কমাবেন না। ব্যাংক খাত বেতন কমানো ও ছাঁটাই শুরু করলে পুরো বেসরকারি খাতে এ প্রবণতা শুরু হবে।

ফলে সামাজিক অস্থিরতা দেখা যাবে, যা অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হবে। আমরা আশা করি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংক সুবিবেচনা পূর্ন সিদ্ধান্ত নিবে করোনাকালীন সম্মুখসারির যোদ্ধা ব্যাংকারদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। 

লেখক: মুহাম্মদ মাছুদুর রহমান, ব্যাংকার ও গবেষক।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন