চট্টগ্রাম মেডিক্যাল থেকে রোগী ও লাশ পরিবহন নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে। রোগী ও লাশ নিয়ে স্বজনরা দালাল চক্র ও বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। করোনাকালে রোগীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তারা গলাকাটা ভাড়া আদায় করছেন।
হাসপাতাল থেকে লাশ পরিবহনে নীতিমালা থাকলেও তারা এর তোয়াক্কা করছেন না। দালালরা হাসপাতালের স্টাফের ছেলে, মেয়ের জামাই, ভাতিজা ইত্যাদি নানা পরিচয় দিয়ে হাসপাতাল এলাকায় রোগী ও লাশ পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কার্যকর মনিটরিং না থাকায় আরো বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন তারা। অ্যাম্বুলেন্সগুলো নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, করোনা ভাইরাসের কারণে হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে। চট্টগ্রামসহ আশপাশের রোগীরা প্রথমেই চমেক হাসপাতালে ছুটে আসছেন। এখানে রোগীরা চিকিত্সা সুবিধা না পেয়ে শহরের অন্য হাসপাতালে ছুটে যাচ্ছেন। রোগীর আসা-যাওয়ার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে দালাল চক্র। ১ থেকে দেড় কিলোমিটার দূরত্বে রোগী পরিবহনের ভাড়া ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায় আদায় করা হচ্ছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দালাল চক্রের সদস্যরা দিনে-রাতে অবস্থান করছেন। কোনো অ্যাম্বুলেন্স রোগী নিয়ে এলে তাদের ফিরতি ভাড়া জোগাড় করে দিয়ে কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা। আবার বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকরা স্থানীয় দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ভাড়া থেকে কমিশন আদায়ের অভিযোগ করেছেন। দালালরা হাসপাতালের স্টাফের ছেলে, মেয়ের জামাই, ভাতিজা ইত্যাদি নানা পরিচয় দিয়ে হাসপাতাল এলাকায় রোগী ও লাশ পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করছেন। জামাই সবুর, তানভীর, সুমনসহ আরো কয়েক জন দালাল রয়েছেন। তারা রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে এই অপকর্ম করে চলেছেন।
চমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আফতাবুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘দালাল চক্রের কথা আমরা শুনেছি। এ ব্যাপারে অনেকেই অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ সরেজমিনে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোগীরা যখন অসহায় তখন তারা এর সুযোগ নিচ্ছেন। আমরা প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স সমিতির নেতাদের ডেকে নীতিমালা অনুসারে সিরিয়াল নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালাতে বলেছি। পাঁচটি গাড়ি সিরিয়ালে রাখা যাবে।’ হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতি মাসে ৭০০/৮০০ রোগী মারা যাচ্ছেন।
প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স সমিতির এক নেতা জানান, ‘নীতিমালা মেনে রোগী পরিবহন করা যাচ্ছে না। করোনার প্রভাব শুরু হওয়ার পর থেকে একটি দালাল চক্র চমেক হাসপাতালের রোগী ও লাশ পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা যাচ্ছে না।’
নীতিমালার মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশবাহী গাড়ি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করবে। এতে হাসপাতালের একজন কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হবে। সার্বক্ষণিক হাসপাতালের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট স্থানে পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স রাখা হবে। পর্যায়ক্রমে এসব গাড়ি লাশ পরিবহনের সিরিয়াল পাবে। বর্তমানে রোগী ও লাশ পরিবহনে এই নীতিমালা প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স চালকরাও মেনে চলছেন না।
নীতিমালায় ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে নগরীতে ৫ কিলোমিটারের মধ্যে যাওয়া-আসা ৮০০ টাকা। নগরীর বাইরে গেলে ছোট নন-এসি দেড় হাজারের সঙ্গে প্রতি কিলোমিটারে ১৪ টাকা, বড় নন-এসি ১৭ টাকা, এসি ও ফ্রিজার ১৯ টাকা এবং পাহাড়ি জনপথ হলে কিলোমিটার প্রতি ১০ শতাংশ অতিরিক্ত ভাড়া যোগ হবে। এছাড়া গাড়ির সঙ্গে দৃশ্যমান কিছু তথ্য রাখার শর্ত রয়েছে। শর্ত হচ্ছে পরিবহন কোম্পানির নাম, অফিসের ঠিকানা, মালিক ও চালকের মোবাইল নম্বর। গাড়িতে ভাড়ার হারের বই রাখতে হবে। গাড়ি লাশ পরিবহনের নকশা অনুযায়ী হতে হবে। কিন্তু প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স নীতিমালার এসব শর্ত মেনে চলছে না।
চমেক হাসপাতালের সামনে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলোর ‘চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি সংগঠন রয়েছে। সমিতির আওতাধীন শতাধিক অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় শহরের ভেতরে হলে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হয়। আর শহরের বাইরে হলে এই ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
চট্টগ্রাম মেডিক্যালে নব্বইয়ের দশকেও ১০/১২টি অ্যাম্বুলেন্স ছিল। এতে লাশ পরিবহনে সাধারণ মানুষ সুবিধা পেতেন। ক্রমান্বয়ে এসব অ্যাম্বুলেন্স বিলুপ্তি হয়ে গেছে। এখন রোগী বা লাশ পরিবহনের জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যালে সরকারি কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই। এর পর থেকে চমেক হাসপাতালে রোগী পরিবহন নিয়ে নৈরাজ্য চলছে।
