চীন-ভারত উত্তেজনার মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অকস্মাত্ লাদাখ সফরে যাইয়া এক ভাষণ দিয়া বলিয়াছেন, ‘সম্প্রসারণবাদের যুগ সমাপ্ত হইয়া গিয়াছে। কাহারো সম্প্রসারণের জেদ চাপিলে সে বিশ্বশান্তির জন্য বিপদ হইয়া উঠে। ইতিহাস বলে, এমন শক্তি বরাবরই ধুলায় মিশাইয়া গিয়াছে বা পিছনে হটিতে বাধ্য হইয়াছে।’ তিনি চীনকে উদ্দেশ্য করিয়া কথাগুলি বলিলেও চীনের নাম উল্লেখ করেন নাই। যেই পরিস্থিতিতেই তিনি কথাটি বলিয়া থাকুন না কেন, তাহার উক্তিটির একটি বাস্তব দিক রহিয়াছে এবং সকলের জন্যই ইহা প্রযোজ্য। সম্প্রসারণবাদীদের একদিন হটিয়া যাইতে হয়। আবার এই কথাও সত্য যে, ইতিহাস হইতে কেহ শিক্ষা নেয় না। যুগে যুগে যাহারাই যেই ক্ষেত্রে নিজেদের শক্তি উপলব্ধি করিয়াছে, তাহারাই দুর্বলের দিকে সম্পসারণবাদী দৃষ্টি লইয়া অগ্রসর হইয়াছে, পেশিশক্তির ব্যবহার করিয়াছে। তাহাদের কেহ তিন মাস টিকিয়াছে, আবার কেহ ৩০০ বত্সর।
জ্ঞাত ইতিহাস হইতেই সম্প্রসারণের প্রবণতা লক্ষ করা গিয়াছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে একসময় পাথরের যুগ ছিল। পাথরকে বিভিন্ন জনপদের আদিম মানুষেরা অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করিতে শুরু করিয়াছিল। ধারালো পাথরই হইয়া উঠিয়াছিল অন্য সম্প্রদায়কে বিতাড়ন করিয়া নিজেদের অবস্থানকে সম্প্রসারিত করিবার মোক্ষম হাতিয়ার। সেই স্থান পরে দখল করিয়াছে ব্রোঞ্জ যুগ। উত্তর আফ্রিকা, আনাতোলিয়া, ককেশাস অঞ্চল, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল দাপাইয়া বেড়াইয়াছে ব্রোঞ্জে শক্তিশালী যাহারা। ইহার পর লৌহ যুগ আসিলে আরেক দফা ক্ষমতার বদল হইল। লৌহজাত অস্ত্রে সজ্জিতরাই দিগিবদিক ছুটিল নিজেদের ক্ষমতা সম্প্রসারণে। তাহার পর শত শত বত্সর ধরিয়া চলিল তলোয়ার-বল্লমের শক্তি পরীক্ষা। যাহার তরবারি যত লম্বা, যত মজবুত, তাহার ঘোড়াই ছুটিয়া গিয়া দখল করিয়াছে দুর্বলের ভিটা।
এই আধুনিক পরমাণু অস্ত্রের যুগ পর্যন্ত মারণাস্ত্রের বহু সংস্করণ হইয়াছে, বহু রূপ পালটাইয়াছে; কিন্তু সেই পাথর যুগের সম্প্রসারণবাদী চরিত্র পালটাইয়াছে কি? ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কথাটি সত্য হইলে আমরাও অপেক্ষাকৃত কম শক্তির দেশ হিসাবে অধিক খুশি হইতাম; কিন্তু তাহা হয় নাই। আমরা প্রতিনিয়তই দেখিতেছি অপেক্ষাকৃত সামরিকভাবে দুর্বল দেশের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িতেছে শক্তিশালী দেশ কোনো রকম মানবতার বিবেচনা না করিয়া, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনুরোধ উপেক্ষা করিয়া। একটি শক্তিশালী দেশ মহাসাগর পাড়ি দিয়া আধুনিক সমরাস্ত্র লইয়া ঝাঁপাইয়া পড়িতেছে তো অন্য আরেক শক্তিশালী দেশ তাহার পার্শ্ববর্তী দেশটিকে সুযোগ পাইলেই গিলিয়া ফেলিতে চেষ্টা করিতেছে। আবার এই আধুনিক সমরাস্ত্রের সহিত অধুনা যোগ হইয়াছে অর্থনৈতিক আগ্রাসন। উহা সরাসরি প্রত্যক্ষ করা না গেলেও বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী দেশের দুর্বল অথনীতির দেশের প্রতি আগ্রাসন ভয়াবহ আকার ধারণ করিয়াছে। তাহার পরও আমরা আশা রাখি, নরেন্দ্র মোদির কথা যেন সত্য হয়। সম্প্রসারণনীতি যেন পৃথিবী হইতে সত্যিই মুছিয়া যায়। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এক দেশের সহিত আরেক দেশের প্রতিযোগিতা থাকুক; কিন্তু বড় অর্থনীতির দেশ যেন ছোট অর্থনীতির দেশকে গিলিয়া ফেলার প্রয়াস না পায়। অতএব, নরেন্দ্র মোদির কথা সত্য হইয়া পৃথিবী হইতে সম্প্রসারণবাদী চিন্তা মুছিয়া গেলে সত্যিই পৃথিবীতে শান্তি আসিতে পারে।
