একটি হাসপাতালের করুণ চিত্র!

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২০, ২১:২৫

বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিত্সা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান চিকিত্সাকেন্দ্র। এই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান আমলে ১৯৬৮ সালে। অর্ধশতকেরও অধিক সময় ধরিয়া এই হাসপাতালটি মানুষের সেবায় কাজ করিয়া আসিতেছে। কিন্তু ইদানীংকালে সমগ্র দেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতে চিকিত্সা-সরঞ্জাম, জনবলসহ যেই সকল সংকট দেখা দিতেছে, তাহার ব্যতিক্রম নহে এই চিকিত্সালয়টিও। বরং একটি বিভাগের প্রধান হাসপাতালটির এমন দুর্দশা দেখিয়া যে কেহ হতবাক না হইয়া পারিবেন না। এই সকল সমস্যা এক দিনে তৈরি হয় নাই; কিন্তু যাহাদের ইহা দেখভাল করিবার কথা, তাহারা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়াছেন। এই হাসপাতালে চিকিত্সার কাজে ব্যবহূত জটিল রোগ নির্ণয়ের প্রায় সকল যন্ত্রপাতি বিকল রহিয়াছে দীর্ঘদিন ধরিয়া। বিকল চিকিত্সা-সরঞ্জামের তালিকায় রহিয়াছে—আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, এমআরআই মেশিন, ক্যানসার রোগীদের কোবাল্ট-৬০ মেশিন, সিটি স্ক্যান মেশিন, ডিজিটাল এক্সরে মেশিন, এনজিওগ্রাম মেশিন, ইটিটি মেশিন, চক্ষু চিকিত্সায় ব্যবহূত লেসিক মেশিন ইত্যাদি। এখানে যেই সকল মেশিনের নাম উল্লেখ করা হইল তাহা ব্যতীত একটি আধুনিক হাসপাতালের কথা কি চিন্তা করা যাইতে পারে?

উপর্যুক্ত বিষয়টি জাতীয়ভাবে তদন্তযোগ্যও বটে। সরকারি হাসপাতালগুলিতে কেন বত্সরের পর বত্সর বিভিন্ন চিকিত্সা-সরঞ্জাম বিকল হইয়া পড়িয়া থাকিবে? তদন্ত শুরু করিলেই দেখা যাইবে কেঁচো খুঁড়িতে গিয়া বাহির হইয়া আসিতেছে সর্প। স্বাস্থ্য খাতে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির ইহা সামান্য একটি চিত্র মাত্র। শুধু বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ নহে, অন্যত্রও বিদ্যমান একই সমস্যা। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অবস্থিত অধিকাংশ সরকারি হাসপাতাল চিকিত্সা-সরঞ্জাম ও জনবলসংকটে যেন ধুঁকিয়া ধুঁকিয়া মরিতেছে। অচল, স্থবির ও শ্রীহীন হইয়া পড়িতেছে। এইখানে চাহিদা অনুযায়ী যথাসময়ে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয় না। সরবরাহ যখন করা হয়, তখন অনেক সময় মাসের পর মাস তাহা বাক্সবন্দি হইয়া পড়িয়া থাকে। সরঞ্জাম অনুযায়ী যথাসময়ে প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য জনবল নিয়োগ করা হয় না। আবার সরঞ্জাম ও জনবল থাকিলেও দায়িত্ব পালনে অবহেলায় মানুষ চিকিত্সা পায় না। ইহার মূল কারণ হইল স্বাস্থ্য খাতের অপরিকল্পিত বেসরকারিকরণ। যে কোনো বেসরকারিকরণ উদ্যোগকে আমরা সকল সময় স্বাগত জানাই; কিন্তু যদি শত শত বেকার ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ানের বেসরকারি হাসপাতালে চাকুরি না দিয়া সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স ও টেকনিশিয়ানদের উপরই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ভর করা হয় এমনকি তাহাদের ব্যবসায়ের পার্টনার হিসাবে গ্রহণ করা হয়, তাহা হইলে তাহারা যে কমিশন লাভের আশায় পরিকল্পিত উপায়ে সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি বিকল রাখিবেন এবং তাহাদের নিয়ন্ত্রিত বেসরকারি হাসপাতালে রোগীদের পরীক্ষানিরীক্ষা করিতে বাধ্য করিবেন, তাহা কে না বোঝেন! এই অচিন্তনীয় ও অন্যায় ব্যবস্থা আর কতদিন ধরিয়া চলিবে এই দেশে?

ইত্তেফাকের খবরে বলা হইয়াছে যে, শেবাচিমের এনজিওগ্রাম মেশিনটি ১০ বত্সরের অধিক সময় ধরিয়া বাক্সবন্দি ছিল এবং এই কারণেও তাহা এখন অচল হইয়া পড়িয়াছে। যাহারা এই জন্য দায়ী তাহাদের কি কোনো বিচার হইয়াছে? ইহা ছাড়া বিপুলসংখ্যক রোগীর ৫০ ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য যেখানে ৫০ জন টেকনোলজিস্ট দরকার, সেইখানে মাত্র পাঁচ জন দিয়া কীভাবে কাজ করা যাইতে পারে? চিকিত্সকেরাও এই ক্ষেত্রে কাজ করেন মাত্র দুই জন। এইখানেই শেষ নহে, গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালটির ২২৪ জন চিকিত্সকের মধ্যে ৯৫টি পদই শূন্য। এইখানে অধ্যাপক মর্যাদার একজন চিকিত্সকও নাই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই ব্যাপারে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাইয়া থাকিতে পারে না। গোটা বরিশাল বিভাগে ডাক্তার, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও চিকিত্সার সাজসরঞ্জামের যে অভাব রহিয়াছে, তাহা দূর করিতে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে।