২ ৯ জুন সোমবার দৈনিক ইত্তেফাকের স্টাফ ফটোসাংবাদিক রেহেনা আক্তার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। রেহেনা আক্তার মরহুম আব্দুল ওহাব শেখ ও ফজিলা বেগমের চার সন্তানের মধ্যে সবার ছোট। তার স্বামী বাচ্চু মিয়া ও দুই কন্যাসন্তান রাদিয়া ইসলাম (১৫) ও রাবাবা ইসলাম (৩)। রেহেনা আক্তারের অকালমৃত্যুতে ইত্তেফাকের বার্তা বিভাগের প্রধানসহ সহকর্মীরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, পাক্ষিক অনন্যা পরিবার, নারী সাংবাদিক কেন্দ্র, উইমেনস জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনসহ অনেক সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তি। রেহেনা কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে মোটরবাইক চালিয়ে কাজ করতেন। প্রতিনিয়তই প্রেসক্লাব আর ঢাকার আশপাশের এলাকায় সহকর্মী নারী-পুরুষ যে-ই হন, তাকে বাইকের পেছনে বসিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিতেন। নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে ছিলেন একজন যোদ্ধা। নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে টিকে থাকার যুদ্ধে অবতীর্ণ রেহেনা নারীর প্রতি সব সময় ইতিবাচক চিন্তা করতেন। তার মৃত্যুর খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহকর্মী বন্ধুবান্ধব লিখেছেন তার সম্পর্কে। তা নিয়েই মহিলা অঙ্গন স্মরণ করছে তাকে।
রেহেনার জন্য শোক...
n সহকর্মী মুন্না রায়হান
কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে মোটরসাইকেলে চেপে রাজধানীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে রেহেনাকে ঘুরে বেড়াতে দেখেননি এমন মানুষ বোধহয় খুব কমই আছেন। একদিন সচিবালয়ে অ্যাসাইনমেন্ট করে বের হয়েছি। ভরদুপুর। ডিআরইউতে খেতে যাব। দেখি পল্টনের মোড়ে জ্যামে আটকে আছেন রেহেনা। সেখান থেকেই চিত্কার করে বললেন, ‘মুন্না ভাই, যাবেন নাকি...?’ বললাম, ‘না, যদি ফেলে দেন...!’ এ রকম হাজারো দিন। কোনো দিন মতিঝিল, কোনো দিন গুলিস্তান, পল্টন। দিন নেই রাত নেই, ছবির জন্য ঘুরে বেড়িয়েছেন এই ফটোসাংবাদিক। অনেক দিন ধরেই রেহেনা আক্তার অসুস্থ ছিলেন। মাস দেড়েক আগে আমাকে মেসেঞ্জারে ফোন দিয়ে বললেন, ‘ভাই অনেক খুশি হয়েছি। অনেক দোয়া থাকল আপনার মেয়ের জন্য। আর আমার জন্যও দোয়া করবেন।’ অপারেশনের পর শরীর এখন আগের চেয়ে ভালো। রেহেনা মারা গেছেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে। এতিম হয়ে গেছে তার কোলের শিশুটি ও স্কুলে পড়া মেয়েটি। সবাই ওদের জন্য দোয়া করবেন।
n সহকর্মী সানজিদা সুলতানা
রেহেনা আক্তার (ইত্তেফাকের ফটোসাংবাদিক), তুমি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে সেই প্রতীক্ষায় ছিলাম। কিন্তু আমাদের নিরাশ করে তুমি পাড়ি জমালে ভিন্ন জগতে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব না। প্রাণভরে দোয়া করি, আল্লাহ তোমাকে জান্নাতবাসী করুণ।
n সহকর্মী মোর্শেদা ইয়াসমিন পিউ
২৯ জুন সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় আমাদের সহকর্মী রেহেনা মারা যায়। দুঃসংবাদটা শোনার পর থেকে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। রেহেনার মিষ্টি হাসির মুখটা চোখের সামনে ঘুরে ফিরছে। কোনোভাবেই এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। প্রতি বিকাল-সন্ধ্যায় চোখ ফেরালেই যাকে দেখতে পেতাম; তার কোনো বিশেষ ছবি হলেই পাশে এসে বলত, ‘আপা, একটা ভালো ক্যাপশন লিখে দিবেন।’ আমরা কত নিউজ একসঙ্গে করেছি। আর আজ রেহেনার শোক সংবাদ আমাকে লিখতে হলো। যেখানেই যাও, ভালো থেকো।
n সহকর্মী সালেহ উদ্দিন
সংগ্রামী এক নারীর জীবনাবসান! রেহেনা আক্তার। ইত্তেফাকের স্টাফ ফটোগ্রাফার। অন্ত্রের জটিল রোগে ভুগে মারা যায়। দুটি বাচ্চা, একটি দুগ্ধপোষ্য। স্কুটি চালিয়ে অফিসে আসতেন। বাসায় ফিরে সংসার সামলাতেন। সংগ্রামী জীবনের চাকা থেমে গেল। ওপারে ভালো থেকো বোন।
n মোজ্জাফর হোসেন
বাংলা একাডেমির সাবেক সহকর্মী মোজ্জাফর হোসেন বলেন, এই হাসিমুখ আর দেখতে পাব না! ২৫ জুন স্ট্যাটাস দিয়েছে :‘একদিন ঠিক ফিরে আসবে তুমি’; আর আজ নিজেই চলে গেল। ইত্তেফাকের আলোকচিত্রী রেহেনা আক্তার। ক্যানসারে ভুগছিল। আমরা একসঙ্গে পাক্ষিক অনন্যায় কাজ করেছি। ভাবতেই পারিনি এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে। ওর শিশু দুটোর কথা ভাবতেই পারছি না। ফুলের মতো শিশুরা নিশ্চয় এই সরল বিশ্বাস নিয়ে অপেক্ষা করবে ওদের মায়ের, রোজ যেভাবে স্কুটিতে চেপে ঘরে ফেরে মা :‘একদিন ঠিক ফিরে আসবে তুমি।’ মৃত্যুশয্যায় যখন সে, তখনো তার পরিবারকে আগের হাউজের কাছে (আলোকিত বাংলাদেশ) বেশ কয়েক মাসের অনাদায়ী বেতন চাইতে হয়েছে। দিয়েছে কি না, জানি না। আশা করি সাংবাদিক সংস্থা ও সাংবাদিকেরা ওর শিশু দুটোর কথা ভাববে।
n মুজাহিদ শুভ
সময় নিউজ টিভির সাংবাদিক মুজাহিদ শুভ বলেন, ওপারে পাড়ি দেওয়া ৩২ বছর বয়সি দৈনিক ইত্তেফাকের এই সংবাদকর্মীকে চোখের সামনে কেবল ছুটতেই দেখেছি। কথা বলার সুযোগ হয়নি কখনোই। আজ মনে হয় একজন সত্যিকারের সংবাদকর্মীর মডেল ছিলেন তিনি। আল্লাহ বেহশত নসিব করুন। ক্যানসার আর কতজনকে কেড়ে নেবে!
n পারভীন মাহমুদ
ইউসেপ বাংলাদেশ-এর প্রেসিডেন্ট পারভীন মাহমুদ এফসিএ বলেন, ‘খুব দুঃখ লাগছে। রেহেনা আমার বড়ই আপন হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ ওর বাচ্চাদের হেফাজত করুন। খুবই কর্মঠ ছিল। সব সময় হাসিমাখা মুখে অনেক কষ্ট করেছে। আল্লাহ বেহেশত নসিব করুন।
n আ হ ম ফয়সল
এনজিও ডরপ-এর মিডিয়া কমিউনিকেশন ম্যানেজার আ হ ম ফয়সল বলেন, রেহেনা আপার হাসিমাখা মুখটির কথা বারবার মনে পড়ছে। কখনো তার মধ্যে কোন অহংকার দেখিনি। দেখা হলে খোঁজখবর নিতেন ও বলতেন, ‘কোনো কাজ থাকলে বইলেন’। কাজ দেওয়ার অনেক সুযোগ তৈরি হবে জানি কিন্তু রেহেনা আপাকেতো আর কখনো পাব না। দুটি সন্তান রেখে তার চলে যাবার কষ্টটা বোঝাতে পারব না কাউকে।
