কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পে চরম দুর্দিন, প্রণোদনা দাবি

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২০, ২২:৫১

কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পে চরম দুর্দিন এনেছে করোনা। পর্যটনের ভর মৌসুমে বিনিয়োগের টাকা ঘরে তোলার অপেক্ষাকালেই করোনার থাবায় জনশূন্য জনপদে পরিণত হয় বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকতের নগরী কক্সবাজার। মার্চের মধ্যবর্তী সময় থেকে শুরু হওয়া দুরবস্থা এখনো বিদ্যমান। চড়া সুদে ঋণ কিংবা ঘরের শেষ সম্বল বিক্রি করে পর্যটন ব্যবসায় আসা কয়েক হাজার ব্যবসায়ীর এখন পথে বসার উপক্রম। দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখ করার মতো ভূমিকা রাখা পর্যটনশিল্প এখন নিজেই ধুঁকছে। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি প্রণোদনা কিংবা স্বল্প সুদে ঋণসহায়তা কামনা করছেন ব্যবসায়ীরা।

পর্যটনকে ঘিরে সৈকতের তীর ঘেঁষে কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনে বিশ্বমানের দৃষ্টিনন্দন অর্ধসহস্রাধিক হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। বেশির ভাগ আবাসিক ভবন দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় পক্ষ ভাড়ায় নিয়ে সেবা কার্যক্রম চালায়। তারকা হোটেলগুলো চলছে ব্যাংক লোনে। করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার পর মার্চ থেকে সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা হলে বন্ধ হয়ে যায় পর্যটনসংশ্লিষ্ট সব ব্যবসাও। এতে কক্সবাজর শহরের সাড়ে চার শতাধিক আবাসিক হোটেল, ৫০০-এর অধিক রেস্তোরাঁ, দুই শতাধিক ট্যুর অপারেটর অফিসসহ সংশ্লিষ্ট অর্ধলাখ কর্মজীবী বেকার হয়ে পড়েন। জমানো টাকায় কোনো মতে মাস দেড়েক চললেও বর্তমানে পরিবার নিয়ে অর্ধাহার-অনাহারে কাটছে তাদের দিন।

করোনার সংক্রমণ জ্যামিতিক হারে বাড়ায় কক্সবাজারে রেড জোন ঘোষণা ৩০ জুন পর্যন্ত চলমান ছিল। ১ জুলাই থেকে সীমিত আকারে খুলেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ বলছে, করোনার কারণে ১০ হাজার কোটি টাকার অধিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে কক্সবাজার। এই ধাক্কায় দেউলিয়াত্বের শঙ্কায় রয়েছে হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্টসহ পর্যটন ব্যবসা। পহেলা বৈশাখ, ঈদুল ফিতরে জমজমাট ব্যবসার আশা থাকলেও বাণিজ্য ছিল শূন্যের কোঠায়। আসন্ন ঈদুল আজহায়ও ব্যবসা হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ট্যুরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম বলেন, ‘প্রতি বছর এখানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে অর্ধকোটি পর্যটক আসেন। তাদের যাতায়াতে প্রতিদিন দূরপাল্লার অনেক বাস ও ১০-১২টি ফ্লাইট যাতায়াত করে। দীর্ঘ প্রায় চার মাস যাবত্ সবই বন্ধ। এতে আমরা হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনছি।’

তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু বলেন, ‘ঝলমলে হোটেলটির পরিবেশ করোনার কারণে বিগত তিন মাস ধরে ভূতুড়ে। হোটেল দেখভালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শতাধিক কর্মচারীকে হোটেলের ভেতরেই রাখা হয়েছে। করোনাকালের প্রথম দুই মাস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নিজেদের ফান্ড থেকে দিয়েছি। কিন্তু জুন ও চলতি মাসে চরম বেকায়দায় পড়েছি। এভাবে আরো কিছুদিন চললে এত বড় প্রপার্টি সামলানোই কঠিন হয়ে পড়বে।’

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি লায়ন এম এন করিম বলেন, করোনা পর্যটনশিল্পকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিয়েছে। ঋণের চাপ, বিদ্যুতের বিল, হোটেল ভাড়ার চাপ পর্যটন ব্যবসায়ীদের বেসামাল করে দিচ্ছে। দিনে দিনে ঋণের বোঝা বাড়ছে, বাড়ছে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার শঙ্কাও। এভাবে আরো কিছুদিন চললে আমরা দেউলিয়া হয়ে যাব। এই পরিস্থিতিতে পর্যটন ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলেই কেবল এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।

কক্সবাজার রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির অর্থ সম্পাদক কলাতলীর ফ্রেশ ইন রেস্তোরাঁর মালিক মোহাম্মদ শফি বলেন, পর্যটনসেবায় সৈকতকেন্দ্রিক প্রায় ৩০০ রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। করোনাকালে সব রেস্তোরাঁ বন্ধ। অনেকের ব্যাংকে লোন রয়েছে, যার নিয়মিত সুদ বাড়ছে। বাড়ছে হোটেলের ভাড়া, অপরিহার্য কর্মচারীদের বেতন।

জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্পের প্রতি সরকারের বিশেষ নজর রয়েছে। চলমান পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত জানিয়ে রেখেছি। পর্যটনসেবীদের জন্য সরকারি কোনো বরাদ্দ এলে তা যথাযথভাবে বিতরণ করা হবে। তবে এখনো পর্যন্ত প্রণোদনা পাওয়া যায়নি।’