সহোদর বাহিনীর হাতে এক গ্রামে তিন খুন

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২০, ২২:৫৫

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমার গ্রামে শিশুসহ তিন জন খুনের কোনো কূলকিনারা আজ পর্যন্ত হয়নি। একই গ্রামে পরপর তিন বছরে তিন জন খুন হলেও ভিকটিমদের পরিবারের অভিযোগ, এক সহোদর চক্র এই হত্যা করে টিকতে না পেরে ঢাকায় পালিয়ে আত্মগোপন করেছে। এই চক্রের বিরুদ্ধে ঢাকার রামপুরাসহ বেশ কয়েকটি থানায় অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে মামলা রয়েছে। তালমার গ্রামের ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছে বিচার দাবি করেছেন। এই দাবির কথা জানতে  পেরে সহোদর চক্র মোবাইল ফোনে ঐসব পরিবারকে হুমকি দেয়। সহোদর চক্রের সদস্যরা ভুক্তভোগীদের বাড়িতে গিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি না করার হুমকি দিয়ে আসে।

এ ব্যাপারে ফরিদপুর জেলা পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান বলেন, এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা খারাপ প্রকৃতির লোক। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দুই ভাইয়ের মধ্যে এক জনের বিরুদ্ধে ঢাকার রামপুরা থানায় অস্ত্র মামলা রয়েছে বলে তথ্য পেয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে আরো মামলা থাকতে পারে।   

তালমার স্কুলছাত্র আলাউদ্দিন অন্তরকে ২০১৮ সালের জুন মাসে অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা। এর পর ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ না পেয়ে ১৩ বছর বয়সি এই স্কুলছাত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

নিহত অন্তরের মা জান্নাত বেগম বলেন, ‘ছেলেকে অপহরণ করে সহোদর বাহিনী। এর পর সন্ত্রাসীরা ফোন করে বলেছিল, অন্তরকে পেতে হলে ১০ লাখ টাকা লাগবে। অনেক কষ্টে প্রথমে ১ লাখ টাকা দেই ওদের। এতেও ওরা ছেলেকে ফিরিয়ে দেয়নি আমার বুকে। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে আরো এক লাখ ৪০ হাজার টাকা এনে দেই ওদের। এরপরও ছেলেকে ফিরিয়ে না দিয়ে ১০ লাখ টাকাই চায় ওরা। কিন্তু গরিব মানুষ এত টাকা পাব কোথায়। দিতে পারিনি। পরে অন্তরকে ওরা হত্যা করে। বেশ কয়েক দিন পর ছেলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মামলা করি ওদের বিরুদ্ধে। এর কিছুদিন পর সহোদরের প্রধান সহযোগী জুবায়েরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার কাছ থেকে অন্তরের মোবাইল ফোন উদ্ধার করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্য থেকে পুলিশ সহোদরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সুজন, খোকন, আরশাদ, আজিজুল ও মাহবুবকে গ্রেফতার করে। তবে অজানা কারণে ঐ সহোদরকে পুলিশ এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি।’

এর আগে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তালমার গ্রামে শাহাজাহান নামে এক এনজিও কর্মীকে অপহরণ করে মুক্তিপণ না পেয়ে খুন করে সহোদর চক্র। ঐ বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি নগরকান্দা থানায় মামলা দায়ের করেন নিহত শাহজাহানের ভাই হাবিব। এ হত্যা মামলাটি বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে। জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মো. এমদাদ হোসেন বলেন, মামলাটির তদন্ত করছি। তদন্তের পর বিস্তারিত বলা যাবে।

এ মামলার বাদী নিহত শাহজাহানের বড় ভাই হাবিব বলেন, ‘আমার ভাইকে অপহরণ করে মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে হত্যার পর লাশ গুম করে সহোদর বাহিনী। এখন মামলা তুলে নিতে প্রতিনিয়ত হত্যার হুমকি দিচ্ছে এই বাহিনী। ভয়ে স্ত্রী সন্তান নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে  বেড়াচ্ছি।’ 

গত বছর ৪ এপ্রিল তালমার গ্রামে ৮০ বছর বয়সি বৃদ্ধ সুবহান মাতব্বরকে অপহরণের পর মুক্তপণ না পেয়ে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে ফেলে দেয়। পরে তাকে উদ্ধার করে উন্নত চিকিত্সার জন্য ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েক দিন পর চিকিত্সাধীন অবস্থায় বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। এই হত্যার ঘটনায় নিহতের ভাতিজা শওকত আলী বাদী হয়ে নগরকান্দা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ ব্যাপারে মামলার বাদী বলেন, ‘আমার চাচাকে সহোদর বাহিনী হত্যা করেছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর থেকে ওরা আমাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। তাই ভয়ে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসে আশ্রয় নিয়েছি।’