দিন বদলের হাওয়া বেদে পল্লীতে

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৩৯

‘মোরা এক ঘাটেতে রান্ধি বাড়ি, আরেক ঘাটে খাই, মোদের ঘরবাড়ি নাই’ এ রকম অনেক কালজয়ী গান বেদে ও সাপুড়েদের নিয়ে রচিত হলেও এখন আর তেমন চোখে পড়ে না বেদেদের সেই চিরোচেনা জীবনাচার। বেদেদের সাপ ধরা, সাপ নাচানো, বীণের সুরে সাপের খেলা দেখানো, সিঙ্গা লাগানো, তাবিজ বিক্রি এবং দাঁতের পোকা ফেলা এই চেনা দৃশ্যগুলো আর তেমন চোখে পড়েনা।

জীবিকার তাগিদে নদীতে সারি সারি নৌকায় পাল তুলে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভেসে বেড়ানো বেদেদের জীবনে লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। অবহেলিত এ গোষ্ঠী নিজ প্রচেষ্টায় গাইতে শুরু করেছে জীবনের জয়গান। তাদের কিছু বংশ পাস্পরার প্রাচীন এ পেশায় জীবন যাপন করলেও অপর আরেকটি খুঁজে নিয়েছে তাদের জীবন ধারণের  নতুন অবলম্বন।

বাংলাদেশে বেদেদের আগমন ও বিস্তার নিয়ে রয়েছে নানা মত। গবেষণাও হয়েছে অনেক। এ নিয়ে বেদেদের রয়েছে নানা মত। নৃবিজ্ঞানীদের মতে-বাংলাদেশে বেদেদের আগমন আরাকান অর্থাৎ আজকের মিয়ানমার থেকে। ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন আরাকানরাজ বল্লাল রাজার সঙ্গে শরণার্থী হিসেবে তারা এদেশে এসেছিল। পরবর্তীতে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আবার কারো মতে প্রাচীনকালে তারা সুদূর মিসর থেকে এসেছিল। তারা বেদুইন জনগোষ্ঠীর। বেদুইন থেকে 'বেদে' শব্দের উৎপত্তি।

বেদে সমাজে জনশ্রুতি রয়েছে, ভারতে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার পান্ডুয়াতে বেদেরা এক সময়ে রাজত্ব গড়ে তুলেছিল। আরেকটি জনশ্রুতি রয়েছে, বেদেরা পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুরা জেলার বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের উত্তরসূরি। বেদেদের আগমন ও ছড়িয়ে পড়া সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের এসব মতামত ও জনশ্রুতির কোনটা সঠিক, তা তর্কের বিষয়। তবে এটি প্রায় সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন যে, বেদে সম্প্রদায় বাংলাদেশে কয়েক’শ বছর ধরে আছে এবং এদেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে মিশে গেছে।

আরো পড়ুন: সোয়া ৮ কোটি টাকা উদ্ধারের ঘটনায় বিএনপির অপু গ্রেফতার

সাভার উপজেলার বংশী নদীর তীর ঘেঁষে বক্তারপুর, কাঞ্চনপুর, অমরপুর, পোড়াবাড়ি এ চারটি গ্রাম সাভার 'বেদে পল্লী' বা 'বাইদ্যাপাড়া' নামে পরিচিত। অনেক বেদে পরিবার জায়গা-জমি কিনে সাভার বেদে পল্লীতে তাদের স্থায়ী বসত গড়ে তুলেছে। প্রায় ১৬ হাজার বেদের বসবাস এখানে। মূলত: সাপ নিয়েই কারবার করা সাভার বেদে পল্লীর বর্তমান চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। জীবনের তাগিদে নিজেদের জাত পেশা থেকে সরে এসে জীবন ধারণের নতুন অবলম্বন খুঁজে নিচ্ছেন তারা। অনেকেই বিকল্প পেশা হিসেবে বেঁছে নিয়েছেন স্থানীয় বাজারে দোকান করা, হাঁস-মুরগী ও কবুতর পালন, মাছ চাষ বা কাঁথা সেলাইয়ের মতো গৃহস্থ ঘরের কাজ।

নিজেদের প্রচেষ্টায় দীর্ঘদিনের অবহেলিত এ গোষ্ঠীটির জীবনে মানে লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। সাভার বাইদ্যাপাড়ার ১২/১৩ বছর বয়সী মেয়ে খাদিজা কিছু দিন পূর্বেও যেখানে লাউ ডোগা, কেউটে, সোয়া সাংকনি, সোরাশসহ বিভিন্ন বিষধর সাপ নিয়ে বেদে পল্লীর হাটে খেলা দেখাতো সে এখন বই খাতা নিয়ে স্কুলে যায়।  ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে পল্লীর বেদে যুবক ও তরুণরা। বেদে নারীরাও নিজেদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য হাতে তুলে নিয়েছেন সেলাই মেশিন এবং বিউটি পার্লারের ব্যবসা। বেদে যুবকরা তাদের অলস সময় কাটানোর পরিবর্তে কাপড়ের এবং টেইলার্সের দোকান খুলে সৃষ্টি করেছেন আত্মকর্মসংস্থান, আবার অনেকই গার্মেন্টস ও মিল কারখানা চাকুরী করছেন।

মাদক সেবন ও বিক্রির জন্য যে এলাকাটি ছিল চিরোচেনা, সেই সাভার বেদে পল্লীর চিত্র এখন অনেকটা ভিন্ন। অনেকটা থেমে গেছে নিজেদের মধ্যকার বিবাদ। বন্ধ হয়েছে বাল্য বিবাহ। জীবনমান বদলে যাওয়া এ পল্লীর ঘরে ঘরে এখন কর্মঠ মানুষ।

আরো পড়ুন: স্বামীর মদদে ভাসুরের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক, ধর্ষণের অভিযোগ গৃহবধূর

গত ৪-৫ বছর আগেও সাভারের বেদে পল্লীতে সকাল সন্ধ্যা সাপের হাট বসতো। সরকারি ভাবে  সাপ বিক্রি নিষিদ্ধ হওয়ায় খারাপ সময় অতিক্রম করতে হয়েছে বেদেদের। পূর্ব পুরুষদের পেশায় জীবন ধারণ কঠিন হয়ে পড়ায় বিকল্প পেশা হিসেবে তারা বেছে নেয় মাদক ব্যবসা। দেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় সাপের খেলা দেখাতে গিয়ে সাপুড়েরা সাপের ঝুড়িতে করে নিয়ে আসতো মাদকের চালান। তা বিক্রি করেই চলতো বেদেদের সংসার। ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল সাভার বেদে পল্লীতে।

সাভার বেদে পল্লীর অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, তারা এখনও অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং বিভিন্ন ভাবে অবহেলিত। বেদে পল্লীর রাস্তাঘাট, মানসম্মত ড্রেনেজ সুবিধা, গ্যাসসহ অনেক নাগরিক সুবিধা পাচ্ছেন না তারা। চারটি গ্রাম জুড়ে পল্লীটি গড়ে উঠলেও এখানে নেই কোন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়া জিন্নাত আলী ও হাতেম মিয়ার মতো ৮০ বছরের বৃদ্ধরা বয়স্ক ভাতা থেকে বঞ্চিত। বেদে পল্লীতে নেই কোন কবরস্থান। ফলে কেউ মারা গেলে দাফন করতে হয় পাশের গ্রামে।

এগিয়ে এলেন একজন সুহৃদ:
এই জনগোষ্ঠীর উত্তরণ ও পুনর্বাসনের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়ান ডিআইজি হাবিবুর রহমান। তাদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেন তিনি। পল্লীর ১০৫ জন বেদে নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং তাদের তৈরি পোশাক বিক্রির জন্য “উত্তরণ বুটিকস’ নামের একটি শো-রুম তৈরি করে দিয়েছেন তিনি। বেদে যুবকদের স্বাবলম্বী করতে ৩৫ জনকে গাড়ী চালনা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এ সুহৃদ। বেদে সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকজন সদস্য এখন পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত। কয়েকজন তরুণী শুরু করেছেন বিউটি পার্লারের ব্যবসা। শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য চালু রয়েছে বিভিন্ন কার্যক্রম।

ইত্তেফাক/অনি