এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নীরবে প্রস্থান

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২০, ২২:০২

নীরবে না ফেরার দেশে চলে গেলেন বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।  বাংলাদেশ তথা বিশ্ব হারাল এক প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদকে। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী,  টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও অর্থনীতি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. ওয়াহেদুল হক গত ২ জুলাই বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় কানাডার একটি হসপিটালে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ...রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।

তিনি লক্ষ্মীপুর জেলার লাহারকান্দি ইউনিয়নের তালহাটি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আলহাজ মৌলবি হাবিব উল্লাহ ও মাতার নাম আশরাফুননেছা। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়।

সর্বদা প্রচারবিমুখ অসম্ভব মেধাবী মানুষটি ছিলেন সেই আমলের ডাবল স্ট্যান্ড, স্ট্যানফোর্ড থেকে মাইক্রো ইকোনিমিকসে পিএইচডি, টরেন্টো, ক্যালিফোর্নিয়া এবং স্ট্যানফোর্ড  বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাথ এবং ইকোনিমিকসের প্রফেসর, ওয়ার্ল্ডের নামকরা ইকোনিমিস্টদের এক জন তিনি।

কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন অমর্ত্য সেনের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে সেনের থিসিস পেপারের ফাইনাল কারেকশন করে দেওয়ার কথা। বলেছিলেন তার নোবেল পুরস্কার না পাওয়ার কারণগুলো। সে অনুভূতির সারকথা ছিল এমন—একটি মানুষ নিজের চেষ্টায় অনেকদূর যেতে পারেন; কিন্তু সেই সফলতার ফাইনাল ফিনিশিংয়ের ক্ষেত্রে অনেকেরই ভূমিকা থাকে, যেটি হয়তো তিনি পাননি। তা না হলে নোবেল পুরস্কার হয়তো তার ঘরেও আসতে পারত। সেপ্টেম্ব্বর ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ঐ সময়ের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে মতানৈক্যের ফলে তিনি স্বেচ্ছায় তার মন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান।

গভীর জ্ঞানের অধিকারী নিরহংকারী এ মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল, বিনয়-ভদ্র ও অসীম মেধাসম্পন্ন। কারো সম্পর্কেই তিনি কখনো কোনো নেগেটিভ চিন্তা করতেন না। উপকার ছাড়া কারো কখনো কোনো ক্ষতি করেননি তিনি।

লাহারকান্দি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লক্ষ্মীপুর মডেল হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করে  ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন।

ওয়াহিদুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৫ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রথমে কিছুদিন তিনি বার্কেলি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন ও পরে টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তার পর থেকে সেখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. ওয়াহিদুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, অত্যন্ত মেধাবী ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব ড. ওয়াহিদুল হক আমার শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপনার জন্য বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার পক্ষে এ এম এ মুহিত, আব্দুর রব চৌধুরীসহ কিছু সিএসপি অফিসার একটি খসড়া দলিল (Document) প্রস্তুত করেছিলেন; সে সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তিনি দেশ ত্যাগ করেন। বিদেশে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বহুমুখী অবদান রেখেছেন। তিনি পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন।

n লেখিকা : সাবেক শিক্ষার্থী

নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ।