প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুর্নীতির শেকড় অনেক গভীরে। ১৯৭৫ সালের পর সামরিক স্বৈরশাসকেরা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে তা কুক্ষিগত করার জন্য মানুষকে দুর্নীতি শিখিয়েছে। সমাজকে কলুষিত করে গেছে। মানুষ যে আদর্শ ও নীতি নিয়ে চলত, তা হারিয়ে যায়। তারা যে দুর্নীতির বীজ বপন করে গেছে, এখন তা মহিরুহ হয়ে গেছে। যেখানেই কাটেন আবার গজিয়ে ওঠে, যতই চেষ্টা করি, এর মূলোত্পাটন করা যথেষ্ট কঠিন। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে কোভিড-১৯ পরীক্ষার নামে জালিয়াতি করা রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার ইঙ্গিত করে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী এর আগে করোনাকালে স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি নিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদেরের অভিযোগের জবাবে বলেন, বাংলাদেশের মানুষের চরিত্র নষ্ট করে দিয়ে গেছে ১৯৭৫ এর পরে যারা রাতের অন্ধকারে অস্ত্র হাতে নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তারাই। কারণ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে সেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য এরা মানুষকে দুর্নীতি, কালো টাকা ও ঋণখেলাপি শিখিয়েছে। মানুষ আগে যে একটা নীতি-আদর্শ নিয়ে চলতো, দীর্ঘদিন এই মিলিটারি ডিকটেটরশিপ এদেশের মানুষের চরিত্র হনন করেছে। কারণ অবৈধ ক্ষমতাটাকে নিষ্কণ্টক করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। তারা বছরের পর বছর এই দুর্নীতির বীজ বপন করেছে। মানুষের চরিত্রটাই নষ্ট করে দিয়ে গেছে। এই চরিত্রহীনতা একেবারে ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত ছিল। তারপরও এরমধ্যে যে খবরগুলো পাচ্ছেন এটা কারা করছেন? আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর কে কোন দলের সেটা বড় কথা নয়, এই ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, অনিয়মে জড়িত যাকে যেখানে পাচ্ছি আমরা ধরে যাচ্ছি। ধরছি বলেই যেন আমরা চোর হয়ে যাচ্ছি। আমরা ধরি, আবার আমাদেরই দোষারোপ করা হয়।
তিনি বলেন, এটাই হচ্ছে আমাদের দুর্ভাগ্য। এর আগে তো দুর্নীতিটাই নীতি ছিল, অনিয়মটাই নিয়ম ছিল। সেভাবেই রাষ্ট্র চলেছে। কিন্তু আমরা আসার পর সেগুলো মোকাবিলা করার চেষ্টা করছি। যতটুকু পারি সেগুলো আমরা শুদ্ধ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এই অনিয়মগুলো আমরা নিশ্চয়ই মানবো না। যে যাই হোক তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি, নেব এবং এটা অব্যাহত থাকবে।
আধুনিক পাটকলে অভিজ্ঞদেরই চাকরি হবে
রাষ্ট্রায়ত্ত যেসব পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে সময়োপযোগী, আধুনিক করে গড়ে তোলার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, নতুন আঙ্গিকে পাটকলগুলো চালু হলে অভিজ্ঞ কর্মীদেরই সেখানে চাকরি হবে, এজন্য তাদেরকে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, পরিবেশ রক্ষার জন্য যেহেতু সকলেই সিনথেটিক থেকে মুক্তি চায় সেখানে পাট হচ্ছে একটা বিকল্প। সেখানে আমাদের একটা বিশাল সম্ভাবনা বিশ্বব্যাপী রয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে সময়োপযোগী করতে হবে, আধুনিক করতে হবে, নতুন করতে হবে। সে জন্য আমরা আমাদের পাটের যারা শ্রমিক, তাদের যে মজুরির টাকা পাওনা-দেনা যা ছিল, সব মিটিয়ে দেব। তবে আমরা সব টাকা তাদের হাতে দেব না। কারণ নগদ টাকা দিয়ে দিলে তখন দেখা যাবে মেয়ের জামাই, ভাই, ভাতিজা, আত্মীয়-স্বজন সব এসে হুমড়ি খেয়ে পড়বে এবং ভাগ চাইবে।
শ্রমিকদের পাওনা মেটানোর প্রক্রিয়া তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বলেছি অর্ধেকটা সঞ্চয়পত্র করে দেব। পারিবারিক সঞ্চয়পত্র, যেখানে তারা ১১ শতাংশের মতো পাবে। প্রতি তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক পাবে, যা প্রতিদিন সে কাজ করে মাসে মজুরি পেত, তার চেয়ে বেশি টাকাই পাবে। সেটা আমরা হিসাব করছি, যা পাওনা ছিল সেটা আমরা সব শোধ করে দেব।
নতুন করে পাটকলগুলো চালুর পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা এটাকে নতুনভাবে করব, আগ্রহীদের ট্রেনিং দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন করে তাদেরকে তৈরি করব। বিশ্বে বাংলাদেশের পাট ও পাটপণ্যের বাজার ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এইভাবে তো একটা ইন্ডাস্ট্রি চলতে পারে না। আর এই ইন্ডাস্ট্রিগুলো হচ্ছে সব থেকে পুরোনো। সেই ষাটের দশকে, পঞ্চশের দশকে করা। এই ইন্ডাস্ট্রি দিয়ে আসলে লাভ করা সম্ভবও না। সে জন্য আমরা চাচ্ছি এটাকে আবার নতুনভাবে তৈরি করতে। কারণ পাটের একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ রয়েছে। পাট আমাদের অর্থকরী ফসল।
আর্থিক সহযোগিতা আরো বৃদ্ধি করব
মহামারি করোনা জয় করার জন্য মনে সাহস রাখা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনা শুনলেই মৃত্যুভয় পেয়ে বসে। কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়। তবে আমাদের দেশে করোনায় মৃত্যুর হার কম, সুস্থতার হার অনেক বেশি। করোনার ভয়ে আতঙ্কিত হব কেন? ভয়কে জয় করতে হবে। মরার আগে মরব কেন?’
করোনায় মানুষের কথা সরকার বেশি ভেবেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এমন একটা ভাইরাস, যা চোখে দেখা যায় না, একটা অদৃশ্য শক্তি। অথচ এর জন্য সারা বিশ্ব আজ আতঙ্কগ্রস্ত। এই অবস্থার মধ্যে চলতে গিয়ে আমাদের দেশের মানুষ করোনা ভাইরাসে যেন নিঃস্ব হয়ে না যায়, কষ্ট না পায়। আমরা করোনা মোকাবিলায় একটি নীতিমালা গ্রহণ করেছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সরকারি ব্যয় যদি বৃদ্ধি পায়, পাবে। মানুষকে যেন ঘরে বসে থাকতে না হয়। তারা যাতে কাজ পায় সেই ব্যবস্থা করব, যাতে কর্মসৃজন বেশি হয়। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আর্থিক সহযোগিতা আরো বৃদ্ধি করব।’
ঘরে বসে খুঁত ধরা যায়, মাঠে কিন্তু আমরাই আছি
এবারের বাজেট সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছি। উন্নয়ন বাজেট আমরা দিয়েছি ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার। করোনার কারণে সবটুকু আমরা অর্জন করতে পারব কি না, অনেকেই সেই প্রশ্ন তুলেছেন। বাজেট বক্তৃতায় এটা নিয়ে বিস্তারিত বলতে চাই না। এটা বলব, আমরা আশাবাদী।’
করোনা পরিস্থিতি ও বাজেট নিয়ে সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এনজিও এবং অন্য রাজনৈতিক দল সমালোচনা করছে। ঘরে বসে বাজেটের সমালোচনা করতে পারেন। সরকারের কাজের খুঁত ধরা যায়। তবে মাঠে কিন্তু আমরাই আছি। বঙ্গবন্ধুর গড়া আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারাই আছেন। মাঠে অন্যদের দেখা যায় না।’
তিনি বলেন, সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাসের কারণে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে এই সংসদ চলেছে। মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত এবং করোনার কারণে সব জায়গায় অর্থনীতির চাকা বন্ধ। যোগাযোগ বন্ধ। মানুষের স্বাধীন জীবন যেন একটি অদৃশ্য শক্তির কারণে স্থবির হয়ে গেছে। এ ধরনের অবস্থা কিন্তু অতীতে কখনো দেখা যায়নি। ঠিক সেই অবস্থার মধ্যে দেশের মানুষের জীবনমান রক্ষার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ হবে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করার জন্য ২ হাজার ডাক্তার ও ৫ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়েছি। আরো ২ হাজার ডাক্তারের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। হেলথ টেকনোলজিস্ট ও অ্যাটেনডেন্ট পদে ৩ হাজার পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।’
