মরণঘাতী বায়ুদূষণ

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:২০

 

বায়ুদূষণে মানুষ শুধু নানা রোগেই আক্রান্ত হচ্ছে না, অকাতরে জীবনও হারাচ্ছে। বায়ুদূষণের ফলে যেসব রোগে মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে তার মধ্যে রয়েছে তীব্র শাসকষ্টজনিত রোগ, ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগ, ফুসফুস ক্যান্সার, হূদরোগ ও স্ট্রোক। বিশেষত নগর এলাকাগুলো মৃত্যুকূপে পরিণত হচ্ছে বায়ুদূষণের কারণে। অথচ একটু সতর্ক হলেই বায়ুদূষণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য জনসচেতনতা সৃষ্টিতে যেমন উদ্যোগ নিতে হবে, তেমনি যেসব কারণে বায়ুদূষণ ঘটছে তা রোধে প্রশাসনকে দেখাতে হবে কঠোর মনোভাব।

পরিবেশবিদদের মতে, ঢাকার চারপাশে থাকা ইটভাটা ও শিল্প-কলকারখানা এবং পুরনো মোটরযান থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া এবং যত্রতত্র খোলা ডাস্টবিন বায়ুদূষণের মাত্রা বৃদ্ধি করছে। ধূলিময় ঢাকায় এখন প্রাণভরে শ্বাস নেওয়াই সম্ভব হয় না। পথচারীদের ব্যবহার করতে হচ্ছে মাস্ক। বায়ুদূষণের অশুভ প্রতিক্রিয়ায় মানুষ শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুস ক্যান্সার ইত্যাদিতে আক্রান্ত হচ্ছে। যানবাহন বৃদ্ধি পাওয়ায় গত কয়েক বছরে ঢাকার বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন মতে, ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ের  চেয়ে পাঁচগুণ বেশি। বর্তমানে সিসাযুক্ত পেট্রল আমদানি ও দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনবিশিষ্ট বেবিট্যাক্সি চলাচল বন্ধ করার পরও বায়ুদূষণ প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। ফিটনেস ও কালো ধোঁয়ার সহনীয় মাত্রা পরীক্ষা ছাড়াই ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন ঢুকছে বহু ট্রাক। এসব বাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসকে বিষিয়ে তুলছে। বিশেষ করে ঢাকার পাশেই নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, সাভার, ধামরাই, টঙ্গী, যাত্রাবাড়ী, লালবাগ ও হাজারীবাগে শিল্প-কারখানা অবস্থানের কারণে আশঙ্কাজনক হারে বায়ুদূষণ হচ্ছে। নিজেদের স্বার্থেই এ বিপদ মোকাবিলায় ত্বরিত্ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এ ব্যাপারে সরকার ও পরিবেশ সংগঠনই শুধু নয়, নাগরিকদেরও উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

ত্রুটিপূর্ণ বাস, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি, বেবিট্যাক্সি এবং বিভিন্ন কারখানা থেকে কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত রাসায়নিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। এখান থেকে মিথেন, ইথেলিন বাতাসে মিশ্রিত হয়ে প্রাাণিদেহে প্রবেশ করছে। তাছাড়া চামড়াশিল্প, রং কারখানা, রাসায়নিক গবেষণাগার, পয়োশোধনাগার থেকে উত্পন্ন হাইড্রোজেন সালফাইডের সবই জীবজগতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কঠিন বর্জ্য-আবর্জনা পোড়ানোর ফলে বাতাসে মিশে যাওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে এসবেস্টস আঁশ, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মাণ থেকে ধুলাবালি, সিগারেটের ধোঁয়া ও কীটনাশক স্প্রের কণা প্রতিনিয়ত বাতাসকে দূষিত করে মানবদেহে ক্যানসারসহ অ্যালার্জিজনিত নানা জটিল রোগের সংক্রমণ ঘটাচ্ছে।

এই সমস্যা সমাধানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। শুধু সরকারি উদ্যোগই নয়, প্রয়োজন এর সঙ্গে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে যুক্ত করে দেশের মানুষকে আরো সচেতন করে তোলা। বৃক্ষনিধন বন্ধ করে দেশব্যাপী বনায়ন কর্মসূচিকে উত্সাহিত করতে হবে। সেইসঙ্গে দূষণমুক্ত জ্বালানি ব্যবহারে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। ইটভাটাগুলো আধুনিকায়ন করতে হবে। নির্মাণকাজে যাতে ধুলা কম হয়, সে বিষয়ে তদারকি বাড়াতে হবে।

ঢাকা