রাণীনগর (নওগাঁ) সংবাদদাতা
রাণীনগরের আতাইকুলা গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী একমাত্র ঐতিহাসিক বধ্যভূমিতে স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। জোটেনি জাতীয়ভাবে কোনো স্বীকৃতি।
জানা গেছে, পাক-হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত ৫২ জন শহীদের পরিবার এখনও পায়নি স্বীকৃতি, সাহায্য সহায়তা, বিধবা ভাতা কিংবা বয়স্ক ভাতা। বাড়ির কর্তাদের হারিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে ওইসব শহীদ যোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা।
যুদ্ধের সময় নারকীয় ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যাওয়া আতাইকুলা গ্রামের প্রদ্যুত চন্দ্র পাল, সাধন চন্দ্র পাল ও নিখিল চন্দ্র পাল বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল সকাল ১০টার দিকে ছোট যমুনা নদী পার হয়ে আসে একদল হানাদার বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামে আছে বলে তারা সন্দেহ করে প্রথমে গ্রামটিকে ঘিরে ফেলে প্রতিটি বাড়ি থেকে নগদ টাকা স্বর্ণালংকারসহ বাড়ির নারী-পুরুষকে ধরে ওই গ্রামের বলরাম চন্দ্রের বাড়ির উঠানে নিয়ে যায়। সেখানে পুরুষদের উঠানে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে রাখে আর উঠানের পাশেই নারীদের এক ঘরে রাখে। একের পর এক নারীদের উপরে চালায় পাশবিক নির্যাতন। পরে সারিবদ্ধ পুরুষদের উপরে চলে ব্রাশফায়ার। মুহূর্তের মধ্যেই ওই গ্রামের ৫২ জন শহীদ হন। পরে তারা বিভিন্ন বাড়িতে লুটপাটসহ অগ্নিসংযোগ করে চলে যায়। শহীদদের মধ্য থেকে গুলিবিদ্ধ হয়েও কোনোরকমে বেঁচে যান প্রদ্যুত পাল, সাধন পাল ও নিখিল পাল। তারা জানান, স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও কোনো সরকারের আমলে এই শহীদ পরিবারগুলো এখনও কোনো স্বীকৃতি কিংবা সাহায্য-সহায়তা পায়নি। কোনো স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠেনি এই বধ্যভূতে।
সাধন পাল জানান, এখানে সেই সময় তিনদিন ধরে ৫২ শহীদের লাশ পড়ে থাকার পর পাশের গ্রামের লোকজন এসে কোনোরকম ঘটনাস্থলের পাশেই মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখে।
বিধবা রেনু বালা, ফেন্তু বালা ও সবেজু বালা তাদের সেই দিনের করুণ কাহিনির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, স্বামীকে হারিয়ে ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে অনেক দুঃখে-কষ্টে, অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে এখনও বেঁচে আছেন তারা। কোনো সরকার তাদের সাহায্য-সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়নি। তাদের ভাগ্যেও জোটেনি বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. ইসরাফিল আলম বলেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। এই বধ্যভূমির সংস্কার ও জাতীয়ভাবে স্বীকৃতির জন্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় বরাবর একাধিকবার আবেদন করেছি। এছাড়া এই গ্রামে যে ক’জন বীরাঙ্গনা বেঁচে আছেন তাদের স্বীকৃতি ও সকল সুযোগ-সুবিধার জন্যও আমি অনেকবার মন্ত্রণালয়কে মৌখিক ও লিখিতভাবে জানিয়েছি। আশা করছি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতিসহ এই বধ্যভূমির আধুনিকায়নের কাজ শুরু করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
