বাংলা গানে বলা হইয়াছে, ‘নদীর কূল নাই কিনার নাই’। বাংলাদেশের দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রসঙ্গেও একই কথা বলা যায়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রে বালিশকাণ্ড ও সম্প্রতি ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির পর রিজেন্ট হাসপাতালের করোনার বালতি টেস্ট লইয়া দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়াছে। সরকারের সদিচ্ছা থাকিবার কারণেই বিভিন্ন পর্যায়ের নানা বিস্ময়কর অনিয়মের মুখোশ উন্মোচিত হইতেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশ ও দশের কল্যাণে দিবারাত্রি অক্লান্ত ও নিরলস পরিশ্রম করিয়া যাইতেছেন; কিন্তু একশ্রেণির অপরিণামদর্শী ও লোভী মানুষের কারণে তাহার সেই প্রচেষ্টা ও সফলতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্লান হইয়া যাইতেছে।
বাংলা প্রবাদে আছে, ‘সর্ব অঙ্গে ব্যথা ঔষধ দিব কোথা’। এই দেশে দুর্নীতি আসলে কোথায় নাই সেটা প্রমাণ করাই কঠিন। বলা যায় ইহা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের অন্যতম একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে বাংলাদেশসহ অনেক দেশের দুর্নীতির রাহুগ্রাস হইতে বাহির হইয়া আসিবার প্রাণান্তকর চেষ্টাও বিদ্যমান। দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ দুর্নীতি ও অনিয়ম ঢুকিয়া পড়িয়াছে। নতুবা দুই-তৃতীয়াংশ প্রাইভেট-ক্লিনিক এবং হাজার হাজার পরিবহন কীভাবে লাইসেন্স ছাড়া চলিতে পারে? দুনীতি একপ্রকার ইনফেকশন ডিজিজ বা সংক্রমিত রোগ। ব্যবস্থা না লইলে তাহা ছড়াইতে বাধ্য। অফিস-আদালতে ঘুষ এখন যেন এক অপরিহার্য বস্তু। নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার ইত্যাদি বাণিজ্য পূর্বের মতোই রমরমা। ঘুষের রেট যেইভাবে বাড়িয়া যাইতেছে এবং লজ্জা-শরমের মাথা খাইয়া অবৈধ লেনদেন চলিতেছে তাহাতে দেশপ্রেমিক ও বিবেকমান মানুষের মাথা হেট হইয়া আসে। আসলে ইহার পিছনে রহিয়াছে প্রশাসনের একশ্রেণির হর্তাকর্তা ও প্রভাবশালীদের ভৌতিক শক্তি ও ছত্রছায়া। নতুবা ১৮০ কোটি টাকা ক্যাশ, চেক বন্ডসহ ২০০ কোটি টাকা বাসা হইতে কীভাবে উদ্ধার হয়? কীভাবে একজন রানিং এমপি বিদেশে গিয়া ভয়াবহ দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার হন? কীভাবে মানি লন্ডারিংসহ দেশের বাহিরে অর্থপাচারের অভিযোগ ওঠে? ইহার অর্থ এই নহে যে, শুধু এই সরকারের আমলেই এমনটি ঘটিতেছে। অন্য সরকারের আমলে একসময় পৃথিবীতে এই ব্যাপারে আমরা ছিলাম চ্যাম্পিয়ন। ইহাতে বোঝা যায়, আমরা মানবিকতা, নৈতিকতাবোধ ও মনুষ্যত্ববোধ হইতে দিনদিন দূরে সরিয়া যাইতেছি। র্যাব-পুলিশ তাহাদের গ্রেফতার করিলে তাহাদেরও বলিতে শোনা যায়, ‘আমি সম্মানি মানুষ, আমাকে বেইজ্জত করবেন না’। অর্থাত্ চোর-ডাকাতেরও ইজ্জত আছে বইকি!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়াছেন—দেশে চলমান মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকিবে। তাহার এই সাহসী পদক্ষেপের জন্য আমরা ধন্যবাদ জানাই। এমনকি তাহার পরিবারের নামও যাহাতে কেহ ব্যবহার করিতে না পারে, এইজন্য সকলকে সতর্ক করিয়া দিয়াছেন। দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখিতে হইলে এমন কঠোর পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নাই। দুর্নীতি প্রতিরোধ করিতে হইলে জনগণকেও সচেতন হইতে হইবে। অর্থাত্ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের হাত, মুখ ও মন হইতে ঘৃণার জিহাদ অব্যাহত রাখিতে হইবে।
