শাজাহান সিরাজ আর নেই

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২০, ২২:৪৮

মহান স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য এবং সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী বিএনপি নেতা শাজাহান সিরাজ ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে...রাজিউন)। গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে তিনি এভার কেয়ার হাসপাতালে (সাবেক অ্যাপোলো) চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত জটিল রোগে ভুগছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। শাজাহান সিরাজের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

দলের শীর্ষস্থানীয় এই নেতার মৃত্যুতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। আজ বুধবার রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে। তার আগে বেলা ১১টার দিকে তার জন্মস্থান টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা শামসুল হক কলেজ মাঠে ও বাদ জোহর কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজ মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা শাজাহান সিরাজকে বলা হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের চার খলিফার একজন। ১৯৯৫ সালে বিএনপির রাজনীতিতে যোগদানের পর তিনি বিএনপি সরকারের সময়ে মন্ত্রী ছিলেন এবং দলের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৩ সালের পহেলা মার্চ টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে জন্মগ্রহণ করেন শাজাহান সিরাজ। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে শাজাহান সিরাজ ছাত্র-রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। সেই সময় তিনি টাঙ্গাইলের সা’দত কলেজের ছাত্র ছিলেন। এরপর তিনি ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্র-রাজনীতিতে উঠে আসেন। ১৯৬৪-৬৫ এবং ১৯৬৬-৬৭ দুই মেয়াদে তিনি টাঙ্গাইলের সা’দত কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। একজন সক্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যত্থানে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ তিনি সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রবদের সঙ্গে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ১৯৭১ পল্টন ময়দানে ছাত্র জনসভায় বঙ্গবন্ধুর সামনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন শাজাহান সিরাজ। সশস্ত্র যুদ্ধ চলাকালীন তিনি ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ (বিএলএফ) বা মুজিব বাহিনীর কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭০-৭২ মেয়াদে অবিভক্ত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ (যার অন্য নাম নিউক্লিয়াস)-এর সক্রিয় কর্মী, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদেরও নেতা ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পর সর্বদলীয় সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠনে ভূমিকা পালন করেন, যা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিরোধী দল। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রতিষ্ঠাতা সহকারী সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন শাজাহান সিরাজ। পরবর্তী সময়ে জাসদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। জাসদের মনোনয়নে তিনবার তিনি জাতীয় সংসদের টাঙ্গাইল-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শাজাহান সিরাজ ১৯৯৫ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি বিএনপির মনোনয়নেও একবার একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়া সরকারের শেষ পর্যায়ের দিকে নৌপরিবহন মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, শাজাহান সিরাজের মৃত্যুতে টাঙ্গাইলসহ কালিহাতীতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

জেপির শোক

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শাজাহান সিরাজের ইন্তেকালে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম।

বিবৃতিতে জেপির নেতৃদ্বয় বলেন, শাজাহান সিরাজ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ‘ছাত্রলীগ’ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সাংসদ এবং মন্ত্রী। তার ইন্তেকালে জাতি একজন গৌরবদীপ্ত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠককে হারালো। আমরা তার রুহের মাগফেরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাই।

পৃথক এক বিবৃতিতে জাতীয় পার্টি-জেপির প্রেসিডিয়ামের অন্যতম সদস্য, টাঙ্গাইলের বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক সিদ্দিকী, সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য আবু সাঈদ খান এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য আজিজ বাঙাল গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন।