আরবি ১২ মাসের সর্বশেষ মাস জিলহজ, বছরের চারটি সম্মানিত মাসের একটি। অনেক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এ মাস। রসুল (স)-এর জন্মের পূর্বে মুহাররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ—এ চার মাসকে আরব জাতি ‘নিষিদ্ধ মাস’ বলে গুরুত্ব দিত। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত রসুল (স)-এর নবুয়াত প্রাপ্তির পরবর্তী সময় এ মাসগুলোকে আলাদা গুরুত্ব ও মর্যাদায় মহিমান্বিত করেন।
ইসলামে জিলহজ মাসের যেমন গুরুত্ব রয়েছে ঠিক তেমনি এ মাসের আমলেরও গুরুত্ব রয়েছে। এর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘কসম ভোরবেলার। কসম ১০ রাতের।’ (সুরা ফাজর, আয়াত : ১-২) ১০ রাত দ্বারা উদ্দেশ্য জিলহজ মাসের ১০ দিন। (ইবনে কাসির) আরো ইরশাদ করেন, ‘তারা যেন নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।’ (সুরা হজ, আয়াত :২৮) ইমাম বোখারি (রহ) বলেন, হজরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, ‘সুনির্দিষ্ট দিনসমূহ’ দ্বারা জিলহজের ১০ দিন উদ্দেশ্য। অনুরূপভাবে ইমাম আবু হানিফা ও আহমাদ (রহ)সহ অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের অভিমত, সুনির্দিষ্ট দিনসমূহ দ্বারা জিলহজের ১০ দিনকেই বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে ইবনে কাসির ৩ : ২৮৯)
গুরুত্বপূর্ণ এ মাসে গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত বন্দেগি বা আমল করার ব্যাপারে হাদিসে নির্দেশনা এসেছে। ‘হজরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, এ দিনগুলোর (জিলহজের প্রথম ১০ দিন) তুলনায় কোনো আমলই উত্তম নয়। সাহাবায়ে কেরাম (রা) আরজ করলেন, জিহাদও নয়? তিনি (স) বললেন, জিহাদও নয়। তবে যে ব্যক্তি নিজের জানের শঙ্কা ও সম্পদ নিয়ে বের হয়েছে, অতঃপর কিছু নিয়েই ফিরে আসেনি সেটি ভিন্ন।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস নম্বর : ৯১৮) এজন্য ‘হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, আল্লাহর নিকট এ দিনের (জিলহজের প্রথম দশক) তুলনায় কোনো দিনের কোনো আমল অধিক প্রিয় নয়। সুতরাং তাতে তোমরা বেশি করে তাহলিল, তাকবির ও তাহমিদ পাঠ করো।’ (তাবারানি ফিল মুজামিল কাবির)
জিলহজ মাসের প্রথম দশকে বিশ্বনবি (স) রোজা রাখতে বলেছেন। হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী জানা যায়, ‘জিলহজের প্রথম দশকের প্রত্যেক দিনের রোজা এক বছরের রোজার সমতুল্য। আর প্রত্যেক রাতের ইবাদত লায়লাতুল কদরের ইবাদতের সমতুল্য।’ (সহিহ তিরমিযি) বিশেষ করে আরাফার দিন অর্থাত্ জিলহজের ৯ তারিখ রোজা রাখা সুন্নত তার জন্য যে হজে যায়নি। হাদিসে এসেছে ‘হজরত কাতাদাহ (রা) হতে বর্ণিত। রাসুল (স) বলেছেন, আরাফার দিবসে রোজা পেছনের এবং সামনের এক বছরের গোনাহ মোচন করে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর : ১৭৩০, ১৭৩১)
জিলহজ মাসের আবশ্যিক আমল হলো এ মাসের ৯ তারিখের ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর অন্তত একবার তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা। ‘হজরত ইবনে আব্বাস (রা) ৯ জিলহজের ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর সালাত পর্যন্ত তাকবিরে তাশরিক পাঠ করতেন।’ (সুনানে বায়হাকি কুবরা : ৬০৭১) এ তাকবিরে তাশরিক নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের ওপর ওয়াজিব। পুরুষের জন্য আওয়াজ করে, আর নারীদের জন্য নীরবে। (ফাতওয়া শামি ৩ :৬১)
পবিত্র জিলহজ মাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো সচ্ছল (ছাহেবে নিসাব) ব্যক্তি কোরবানি করা। ১০, ১১ ও ১২ জিলহজের মধ্যে নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হলে কোরবানি করা ওয়াজিব। প্রত্যেক ছাহেবে নিসাব নারী-পুরুষের জন্য এ বিধান প্রযোজ্য। (ফাতাওয়া শামি ৯ : ৪৫৩, ৪৫৭, ফাতাওয়া আলমগীরি ৫ : ২৯২)
সকল কুরবানি দাতার জন্য জিলহজের চাঁদ ওঠা থেকে কুরবানি করা পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটা মুস্তাহাব। হজরত উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূল (স) বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা কোরবানি করবে, তারা যেন এই ১০ দিন চুল ও নখ না কাটে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর : ৩১৫০)
lলেখক :তরুণ আলেম
