g তারেকুর রহমান
বন্ধুদের মধ্যে মামুন একটু বয়স্ক। চেহরা সুরতে চলনে বলনে তার বয়সের ছাপ স্পষ্ট। ফ্রেন্ড সার্কেলে প্রায় সবাই বিয়ে করে ফেললেও মামুনের বিয়ের কোনো খবর নেই। মামুনই আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের শেষ ব্যাচেলর। অথচ আমাদের বহু আগে থেকেই বিয়ের বিশাল মানসিক প্রস্তুতি রেখেছিল মামুন। কিন্তু তার বিয়ের সানাই আর বাজে না। বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করলেই মামুনের মুখটা মেঘে ঢেকে যেত, চোখ ছল ছল করত। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু বলত, ‘আমার মনে হয় বিয়ের ফুল আর ফুটবে না। বহু তো চেষ্টা করলাম কিন্তু পারছি না।’
ছাত্রজীবনে মামুন চাপাবাজ টাইপের ছিল। কোথাও কোনো মেয়ে তাকে দেখলেই নাকি প্রেমে পড়ে যেত। এমনকি কোনো আত্মীয়স্বজনের বাসায় গেলে সেখানে মুরব্বিরা তাকে দেখলে পছন্দ করে তাদের মেয়ের জন্য। এসব চাপাবাজি আমাদের এখন মুখস্থ। মামুন বুঝে গেছে আমরা চাপাবাজি ধরতে পারি। তাই এখন আর চাপাবাজি করে না। বাস্তবতার কঠিন এক নিষ্ঠুর পরিণতির কথা মামুন ভাবছে। হয়তো সারাজীবন কুমার হিসেবেই তাকে থাকতে হবে। আমরা মামুনকে সাহস দিলাম, ‘তোর বিয়ে হবেই। যে করেই হোক তোর বিয়ের ব্যবস্থা আমরা করব।’ মামুন শোকাতুর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ আমার চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আমার জন্য কিছু একটা কর। আমার মাকে একটু বুঝানোর চেষ্টা কর।’
‘কেন, আন্টির আবার কী হলো?’
‘এতদিন মা আমার বিয়ের জন্য খুব উঠেপড়ে লেগেছিল। বিয়ের পাত্রী খুঁজে না পাওয়ায় মাও হাল ছেড়ে দিয়েছে।’
‘বলিস কী!’
‘হ্যাঁ, আমার ভাগ্য কত খারাপ বুঝতেই পারছিস!’
‘তুই টেনশন করিস না। আমরা আন্টিকে বুঝিয়ে দেব।’
মামুনের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম ওর মা খুব হতাশ। আমরা যদি ওর বিয়ের দায়িত্বটা নিয়ে নিই, তাহলে ভালোই হয়।
আমরা কয়েকজন বন্ধু গিয়ে মামুনের বাসায় উপস্থিত। আন্টিকে কোনোভাবেই মামুনের বিয়ের ব্যপারে রাজি করানো যাচ্ছে না। অনেক বলে কয়ে শেষ পর্যন্ত রাজি করালাম। খুব বিরক্তি নিয়ে আন্টি বললেন, ‘দেখ, তোমরা কিছু করতে পার কি না। এই হতচ্ছাড়ার জন্য একটা বউয়ের ব্যবস্থা করতে পার কি না।’
আন্টির অনুমতি পাওয়ার পর আমরা বেশ খুশি। অনেকদিন পর মামুনের মুখেও হাসি দেখা দিল। আমরা বন্ধুরা মামুনের জন্য পাত্রী দেখতে বের হয়ে গেলাম। চলতে ফিরতে বহু সুন্দরী দেখতে পেলেও বিয়ের জন্য সুন্দর ও ভালো পাত্রী পাওয়া বেশ মুশকিল। চারদিকে পাত্রীর সন্ধান করতে লাগলাম। এরই মধ্যে কয়েকটা পাত্রীর সন্ধানও পেয়ে গেলাম। একটা মেয়েকে আমাদের বেশ পছন্দ হয়েছে। মামুনকে মেয়ের ছবি দেখানোর পর তারও পছন্দ হয়েছে। মামুন মেয়েকে দেখার আগে ফোনে কথা বলে নিতে চায়। কিন্তু মেয়ে দেখাদেখির আগে ফোনে কথা বলতে রাজি না। তার কথা হলো, দেখে পছন্দ হলে এরপর ফোনে কথা বলা যাবে।
মামুনকে বললাম, ‘চল মেয়েটাকে দেখে আসি।’
‘না, আমি যামু না।’
‘যামু না মানে? তুই বিয়ে করবি, তুই দেখতে যাবি না?’
‘না যামু না।’
‘কেন যাবি না?’
‘যে মেয়ে ফোনে কথা বলতে রাজি না, তাকে আমার পছন্দ হবে না।’
‘আরে ফোনে কথা না বললে পছন্দ হবে না, এটা কোনো কথা!’
‘এসব ঢং করা মেয়েদের আমি বিয়ে করব না। এটা বাদ।’
আচ্ছা আমরা বাদ দিলাম। আমরা এবার নেক্সট অপশন খুঁজতে লাগলাম। আরেকটা পাত্রীর সন্ধান পেলাম। মেয়েটা শিক্ষিত। খুবই ভালো একটা মেয়ে। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। মেয়ের ফেসবুকে ঢুকেই মামুনের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। আমাকে ডেকে বলল, ‘শোন, এ মেয়েকেও আমার বিয়ে করা সম্ভব না।’
‘কেন? এটার আবার কী সমস্যা?’
‘ওর সমস্যা হলো—ও ফেসবুক সেলিব্রিটি, তাই ওকে বিয়ে করা সম্ভব না।’
‘তাতে সমস্যা কী?’
‘সমস্যা আছে, ও কখনোই আমাকে মানবে না। এটাও বাদ দে।’
মামুনের আচরণে আমরা বেশ বিরক্ত। এখন বুঝতে পারলাম আন্টি কেন ওকে বিয়ে করাতে চায় না।
মামুনকে বললাম, ‘বিয়ে করতে হলে কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে হবে।’ মামুন আমাদের কথায় রাজি হলো। তবে কয়েক জায়গায় মামুনকে দেখে ওরাই ‘না’ করে দিয়েছে।
এতকিছুর পরও আমরা হাল ছেড়ে দিইনি। আমাদের লক্ষ্য মামুনকে বিয়ে করানো। বহু কষ্টে একটা পাত্রীকে মামুনের পছন্দ হয়। বিয়ের দিন তারিখও ঠিক হয়ে যায়।
আজ মামুনের বিয়ে। বাইরের আবহাওয়াটাও বেশ সুন্দর। এমন দিনে মামুন ফুরফুরে মেজাজে থাকার কথা। কিন্তু মুখ গোমড়া করে বসে আছে মামুন। বরের সাজে মামুনকে বেশ সুন্দর লাগছে। কিন্তু সে বিমর্ষ হয়ে বুকে একটা বালিশ চেপে বসে আছে। মামুনের অবস্থা দেখে কাছে গিয়ে বসলাম।
‘কীরে, তোর কী হয়েছে?’
‘কিছু না।’
‘কিছু না মানে? তোকে এত বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন?’
‘খুব কষ্ট লাগতেছে।’
‘কেন?’
‘আসলে এতদিন বিয়ে করব করব করে একটা আশা ছিল। কত মেয়ের সাথে টুকটাক ভালোবাসাবাসি চলছে। আর আজ থেকে তো সব বন্ধ হয়ে গেল। তাই মনটা খারাপ।’
‘হারামি এই ছিল বুঝি তোর মনে। এসব ফালতু চিন্তা বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি বের হ।’
বর যাত্রী নিয়ে কনের বাড়িতে আমরা হাজির। আমাদের দেখেই কিছু মেয়ে ‘বর আসছে, বর আসছে’ বলে চিত্কার করতে লাগল। একটা মেয়েকে দেখেই মামুন হা করে তাকিয়ে আছে। মেয়ে মামুনকে একটা ধমক দিয়ে বলল, ‘দুলাভাই, আমি আপনার শালিকা। এইভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন কেন?’
‘না মানে, এত সুন্দর শালিকা থাকলে আর কারও মন খারাপ থাকতে পারে না।’
বরকে শরবত খাওয়ানো হবে। এক গ্লাস খাওয়ানোর পর মামুনের সুন্দরী শালিকা এক গ্লাস শরবত মামুনের গায়ে ঢেলে দেয়। মামুনের সারা শরীর ভিজে যায়। শীতের দিন পানির কারণে ঠাণ্ডায় কাঁপতে লাগল মামুন। শালিকার এরকম কর্মকাণ্ডে মামুনের বেশ রাগ হয়। মামুন বিয়ে না করেই চলে যাবে বলছে। আমরা তাকে মেজাজ না গরম করার জন্য বললাম। এদিকে টাকা না দিলে ভিতরে ঢুকতে দেবে না। আমাদের কাছ থেকে টাকা বের করা অত সহজ না। ফিতা কাটতে না দিলে প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে থাকব তাও টাকা দেব না। কিছুক্ষণ পর বরকে নিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। বরকে দেখে একেকজন একেক কথা বলতে লাগল। একজন তো বলেই উঠল, ‘বর তো মনে হয় বয়স্ক। বরের দেখি কয়েকটা চুল পাকে ধরেছে?’ লোকটার কথা শুনেই মামুন গরম হয়ে বলে, ‘আমার চুল পাকা থাকলে আপনাদের সমস্যা কী?’
বরের মেজাজ গরম হয়ে গেছে। এরই মধ্যে বরের সঙ্গে কয়েকজন তর্কে জড়িয়ে পড়ল। মামুন বিরক্ত হয়ে বিয়ে না করেই চলে যাবে এ সিদ্ধান্ত নিল। সে চলে যাওয়ার জন্য স্টেজ থেকে বের হয়ে এল। আমরা তাকে কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারছি না। কনের বাবা এসে বুঝিয়ে আবার তাকে স্টেজে বসায়।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে গেল। বর আর কনেকে গাড়িতে তুলে দিলাম। এরই মধ্য দিয়ে আমাদের বন্ধু মহলের শেষ ব্যাচেলরের বিয়ের সমাপ্তি ঘটল। g
কার্টুন জ্যোতি
