ভেজাল্লে ভাইয়ের বিয়ে

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:২৪

g শামসুল হক শামস্

 

আমাদের পাড়াতো বড়ভাই ভেজাল্লে। নামের সঙ্গে কাজের বড়ই অমিল। বাস্তবে সহজ-সরল ছেলে। নিজে ভেজালের ধারেকাছে না ঘেঁষলেও ভেজালের জালে প্রায়শই জড়িয়ে পড়েন। বাবা-মায়ের দেওয়া নাম সজল হোসেন। স্কুুলে ভর্তির সময় নামের বানানে খানিকটা ভুল করে আ’কার বসে হয়ে গেছে সজাল হোসেন। সহপাঠীরা মশকরা করে সজাল্লে সজাল্লে বলে ডাকে। একদিন খেলার মাঠে ছাগলের গুঁতা খেয়ে পরে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না করার পর থেকে নাম হয়ে গেছে ভ্যাজাল্লে। আমরা বড় হয়েছি ‘ভেজাল্লে ভাই’ ডেকেই।

সে যাই হোক। ভেজাল্লে ভাই এসএসসি টেস্ট পরীক্ষা দেওয়ার সময় বেঞ্চের তলা দিয়ে মলি আপুর সঙ্গে প্রেমপত্র আদান-প্রদান করার সময় হেডস্যার কর্তৃক ধৃত হন। সে যাত্রায় মলি আপু পিছলে গেলেও পিঠ বাঁচাতে পারেননি ভেজাল্লে ভাই। তাকে ধুমধাম কয়েক ঘা বেতের বাড়ি হজম করতে হয়েছিল। তারপর এসএসসিতে অকৃতকার্য হয়ে লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে ফেলেন। হয়ে গেলেন মুদিদোকানদার। দু-চার গ্রামের মধ্যে ভেজাল্লের দোকান চিনে না এমন মানুষ পাওয়া দায়। সদাই বেচাকেনায় একদম নির্ভেজাল। পচা সাবান যেমন পচা নয়, তেমনি ভেজাল্লের দোকান মানে কোনোরকমের ভেজাল নয়। এই পজেটিভ ইমেজে দোকানদারি করেই অল্প সময়ে অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছেন। কথায় কথায় টাকার বড়াই করেন।

পাড়ার ছেলে-ছোকরাগুলো সুযোগ পেলেই ভেজাল্লে ভাইয়ের দোকানের সামনে আড্ডা দেয়। সেদিন ভেজাল্লে ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বয়স তো অনেক হলো এবার বিয়ে তা করেন ভাই। আমরাও অনেকদিন বিয়েশাদি খাই না।’

ভেজাল্লে ভাই বললেন, ‘বিয়া করতাম কেরে। হুনছি বিয়া নাকি দিল্লাকা লাড্ডু, যে খায় সে পস্তায় আবার যে না খায় সেও পস্তায়। আমি না খায়াই পস্তাইতে থাকি। কও দেহি ডেভিট প্রজেক্ট কইরা আমার কী লাভ? এমুন লস প্রজেক্টে আমি নাই।’

আমি বললাম, ‘বুঝলাম না ভাই। বিয়ে ছাড়া একজন মানুষ পরিপূর্ণ জীবন লাভ করতে পারে না। প্রত্যেকটি মানুষের জীবদ্দশায় বিয়েটা খুব ইম্পোরটেন্ট। আর আপনি এটাকে ডেভিট বলছেন কেন? এটা তো ফুল ক্রেডিট ভাই। সংসারে একটা লাল টুকটুকে বউ যুক্ত হবে। কিছুদিন পর বাচ্চাকাচ্চা হবে। এ সব কিছুই তো ক্রেডিট, তাই না ভাই?’

ভেজাল্লে ভাই বললেন, ‘শোন ছোডো ভাই তোমার কথা আমার সবসময় ভালা লাগে। কিন্তু কথা আছে।’

আমি বললাম, ‘কী কথা ভাই?’

‘কথা অইল আমি বিয়ে করলে তোমরা আমার বউরে ভাবি ডাকবা। কি ডাকবা না?’

আমরা সবাই সমস্বরে জবাব দিলাম, ‘জি ভাই ডাকব তো।’

‘এই তো লাইনে আইছ। আমি এইডা কোনু সময় চাই না যে আমার বউরে কেউ ভাবি ডাহুক।’

আমি বললাম, ‘কেন ভাই ভাবিরে ভাবি ডাকলে সমস্যা কী?’

‘সমস্যা তো আছেই। শোন নাই গরিবের বউরে সবাই ভাবি ডাহে। সামান্য কৃপণ হইলেও আমি তো আর গরিব না!’

কথা না বাড়িয়ে সেদিন আমরা চলে এলাম।

 

গতকাল ভেজাল্লে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। সিএনজি থেকে নেমে বাড়ির ভিতরে ঢুকতেছে। সঙ্গে বোরকা পরা একজন মহিলা। সঙ্গে দুটো পুচকে। আমাকে দেখে মহিলা হিজাব দিয়ে ঘোমটা টানার ভান করল।

জিগ্যেস করলাম, ‘ভেজাল্লে ভাই কোথায় গিয়েছিলেন?’

‘ও ছোডো ভাই, তোমারে তো কওয়াই অয় নাই। আমি তো বিয়া করছি। তয় তোমার কথা মতো ফুল ক্রেডিট নিয়াই করছি।’

আমি বললাম, ‘বুঝিনি ভাই। একটু বিস্তারিত বলেন।’

ভেজাল্লে ভাই বলতে লাগলেন, ‘বিস্তারিত কইলে অনেক সময় লাগব। শর্টকাডে কয়ালাই। লাবরে (ঘটক) আমারে বউ দেহাই তো নিয়া শুধু আঠার-উনিশ বছরের মেয়েদের দেহায়। আমি  কইলাম এইতা চলত না। বিয়া করলে যেহেতু বাচ্চাকাচ্চা অইবোই তাইলে বাচ্চাকাচ্চাসহ বউ দেহাও। তারপর পাইয়া গেলাম। আর দেরি করি নাই। তুমি তো জানো ছোডো ভাই, যা দিনকাল পড়ছে। দুইডা বাচ্চার জন্য সিজার করাইতে আমার লাখ টাকা হাওয়া হইত। আর সেরেলাক, দুধের হিসাব বাদই দিলাম। এই শীতের রাইতে যে মুইত্যা কেথা ভিজাই তো তহন কেমনে সইতাম। হগল দিক বিচার-বিবেচনা কইরা ফুল ক্রেডিট নিয়াই ঘরে ফিরলাম!’    g