সন্ত্রাসী জাকারিয়া বাহিনীর গুলিতে তিন জন ও উত্তেজিত গ্রামবাসীর গণপিটুনিতে এক জনসহ চার জন নিহতের পর খুলনা মহানগরীর মশিয়ালী গ্রামে অগ্নিগর্ভ অবস্থা বিরাজ করছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী সন্ত্রাসী চার ভাই জাকারিয়া, কবির, জাফরিন ও মিল্টনের ফাঁসির দাবিতে এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে। বর্তমানে মশিয়ালী গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে পুলিশ জাহাঙ্গীর হোসেন নামে এক জনকে গ্রেফতার করেছে। অপরদিকে, গ্রামবাসীর ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যার অভিযোগে শেখ জাকারিয়া হাসানকে খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে জাকারিয়া বাহিনীর গুলিতে মশিয়ালী গ্রামের মো. নজরুল ইসলাম (৬০) ও একই গ্রামের গোলাম রসুল (৩০) নিহত হন। এ সময় সাইফুল ইসলাম, আফসার শেখ, শামীম, রবি, খলিলুর রহমান ও মশিয়ার রহমানসহ ৮-১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়। এদের মধ্যে গুরুতর আহত সাইফুল ইসলাম (২২) বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১২টার দিকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থার মারা যান। তিন জনকে গুলি করে হত্যার পর রাত ২টার দিকে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর গণপিটুনিতে সন্ত্রাসী জাকারিয়ার চাচাতো ভাই জিহাদ শেখ (৩০) নিহত হন।
নিহত গোলাম রসুলের মা জাহানারা বেগম আর্তনাদ করতে করতে বলেন, ‘আমার দুই সন্তানকে ভিক্ষা করে মানুষ করিছি; তাদের মধ্যে একজন প্রতিবন্ধী আর এক ছাওয়ালরে ওরা গুলি করে মারে ফেলল। আমি এহন কী কইরে বাঁচে থাকবো।’
স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে মুজিবর নামে এক জন নিরপরাধ ব্যক্তিকে দেশীয় অস্ত্রসহ খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগের সহপ্রচার সম্পাদক জাকারিয়া হাসান এবং তার ভাই খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি জাফরিন, কবির ও মিল্টন পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়। মুজিবরের গ্রেফতারের বিষয়ে জানতে এলাকাবাসী জাকারিয়ার কাছে যায়। তার বাড়ির সামনে যাওয়ার পর কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে জাকারিয়া, জাফরিন, কবির ও মিল্টন তাদের ওপর অতর্কিতে গুলি করে। এ সময় গুলিতে নজরুল ইসলাম, গোলাম রসুল, সাইফুল ইসলাম, শামীম, রবি, সুজন, রানা ও খলিলসহ ৮-১০ জন গুলিবিদ্ধ হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় গুলিবিদ্ধদের উদ্ধার করে ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিত্সক নজরুল ইসলাম ও গোলাম রসুলকে মৃত ঘোষণা করেন। আহতদের প্রাথমিক চিকিত্সার পর খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিত্সাধীন অবস্থায় রাত সোয়া ১২টার দিকে সাইফুল ইসলাম মারা যান। এ ঘটনার পর রাত ২টার দিকে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর গণপিটুনিতে আওয়ামী লীগ নেতা জাকারিয়ার সহযোগী ও চাচাতো ভাই জিহাদ শেখ মারা যান। পরে উত্তেজিত গ্রামবাসী আওয়ামী লীগ নেতা জাকারিয়া, জাফরিন, কবির ও মিল্টন এই চার ভাইয়ের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ ১০টি বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এসময় ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও ঐ এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়নি উত্তেজিত গ্রামবাসী। বর্তমানে মশিয়ালী গ্রামে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এলাকাবাসী জানায়, মশিয়ালী পূর্বপাড়া মসজিদ কমিটির নির্বাচনে খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগের সহপ্রচার সম্পাদক মো. জাকারিয়া সভাপতি পদে প্রার্থী হন। গতকাল শুক্রবার সেই নির্বাচনের দিন ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা জাকারিয়া মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও সুদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকায় গ্রামবাসী তার প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।
খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আবিদ হোসেন বলেন, গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে শেখ জাকারিয়া হাসানকে খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগের সহপ্রচার সম্পাদকের পদ থেকে বৃহস্পতিবার রাতেই বহিষ্কার করা হয়েছে। তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের আর কোনো সম্পর্ক নেই।
এদিকে, গতকাল শুক্রবার সকালে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এম ফজলুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন) সরদার রাকিবুল ইসলাম, সহকারী ডেপুটি পুলিশ কমিশনার সোনালী সেনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে এলাকাবাসী জাকারিয়া, জাফরিন, কবির ও মিল্টনের ফাঁসির দাবিতে মিছিল করে। পুলিশ দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার ও আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়ে এলাকাবাসীদের শান্ত করার চেষ্টা করে। এ সময় ঘটনাস্থলে বিভিন্ন জায়গায় রক্তের দাগ ও বুলেট পড়ে থাকতে দেখা যায়।
খানজাহান আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে মশিয়ালী গ্রামের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। নিহতদের মরদেহ খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) কানাই লাল সরকার জানান, মশিয়ালীতে গোলাগুলির ঘটনায় মোট চার জন নিহত হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকাল ৬টা পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি।
সহকারী পুলিশ কমিশনার (দৌলতপুর জোন) বায়জিদ হোসেন জানান, তিনি আসামিদের ধরতে যশোরের অভয়নগরে অভিযানে রয়েছেন।
