তিন মাস ধরে বন্ধ ক্যাম্পাস। নেই ক্লাস, আড্ডা, ব্যস্ততা। ৬ আগস্টের আগে খুলছে না দ্বার। কীভাবে সময় কাটছে ক্যাম্পাস সারথিদের? দীর্ঘ ছুটিতে কী করলেন আর সামনে আরো কী কী করতে চান— এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক জন শিক্ষার্থী। লিখেছেন— মুসাদ্দিকুল ইসলাম তানভীর
পরম আরাধ্য অবসর এখন কারাগারসম
—মো. তাওহীদ হাসান
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ
করোনা আতঙ্কে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলো অনেকের মতোই ভেবেছিলাম, এই বুঝি কদিন পর খুলেই যাবে। কিন্তু কে জানত এবারের চলে যাওয়া হবে অনির্দিষ্টকালের জন্য। মেডিক্যালের পড়াশোনার চাপে যখন ত্রাহি অবস্থা, তখন বাড়ি ফেরার খবরে মিলত আনন্দের সুবাতাস। অথচ এবার মনে হচ্ছে, ফিরতে পারব তো? দেখা হবে তো আবার চিরচেনা আঙিনা, সহপাঠী, শিক্ষকদের সঙ্গে? আবার নিত্য দিনের ব্যস্ততার ফাঁকে আড্ডা দিতে পারব কলেজ ক্যান্টিনে, হলের চায়ের দোকানে? যে অখণ্ড অবসর এক সময়ে মনে হতো পরম আরাধ্য, এখন তা কারাগারসম। আমার মতোই আর সবাই অপেক্ষা করছে কবে ফিরব আবার আমাদের হাসি, আনন্দ, খুনসুটির জায়গায়। সেই প্রশান্তি আর যা-ই হোক জুমের কিংবা মেসেঞ্জারের চৌকো রঙিন বাক্সে পাওয়া সম্ভব নয়। চারদিকে কেমন চাপা আতঙ্ক, ভয়, কখনো বা স্বজন হারানোর হতাশা, আক্ষেপ। পরিচিত মানুষগুলোর আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনলে বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে ওঠে। নিজের পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষগুলোর জন্য ভয় লাগে। এর মধ্যেই আমাদের ফ্রন্টলাইনাররা কাজ করে যাচ্ছেন। অনেকে আক্রান্তও হয়েছেন। তবু আশায় থাকি কেটে যাবে এ দুঃসময়, আবার আসবে প্রাণ, ফিরব পরিচিত ক্যাম্পাসে, ডুবে যাব প্রতিদিনের ব্যস্ততায় ক্লাসে-ওয়ার্ডে, চা শিঙাড়ার ফাঁকে মেতে উঠব আড্ডায়।
ক্লান্তিময় জীবনে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছি
—মুহসী ফাইয়াজ মর্ম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
গত ১৬ মার্চে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা যখন আসে, অনুভূতিটা তখন অন্য সবছুটির মতো ছিল না। কারণ, আমরা কেউই জানতাম না এই ছুটির শেষটা কবে বা আদৌ এই ছুটি শেষে প্রিয়মুখগুলোকে আবার দেখতে পাব কি না! প্রথমত এই শঙ্কা আর তার সঙ্গে লকডাউনের একঘেঁয়েমি জীবনযাপনে মোটামুটি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ক্লান্তিময় জীবনে একটু বৈচিত্র্য আনতে চিন্তা করলাম পাঠ্যসূচির বাইরে একটু পড়াশোনাতে মনোযোগ দেওয়া যায় কি না। ডিপার্টমেন্টের পড়ার ব্যস্ততায় সাধারণত বিসিএসের বইগুলোতে হাত দেওয়া হয় না, তাই চেষ্টা করছি অবসর সময়টাকে বিসিএসের প্রস্তুতির জন্য সামান্য কাজে লাগাতে। পাশাপাশি অনলাইনে কিছু ফ্রি কোর্স করার চেষ্টা করছি। ছোটবেলা থেকেই রঙিন মাছ পুষি। নিত্য ব্যস্ততায় ঠিকমতো সময় দিতে পারতাম না, সেই দিকে সময় একটু বাড়িয়েছি। তার পরেও এভাবে বন্দিজীবন খুব বেশি দিন কাটানো মনে হয় সম্ভব না। মহান সৃষ্টিকর্তা খুব শিগিগরই এ মহামারি থেকে মুক্তি দান করবেন আর আমাদের সবার পদচারণে মুখরিত হয়ে উঠবে আমার প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয় এই কামনা করি।
ধরিত্রী হয়ে উঠুক মানবিক
—আদীব রাহেমান
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
করোনার এই সংকটময় সময়ে গোটা বিশ্ব থমকে গেছে। থমকে গেছে বিশ্ব অর্থনীতি, শিক্ষা ও চিকিত্সাব্যবস্থা। স্বাধীনচেতা মানুষগুলো আজ একপ্রকার খাঁচায় বন্দি। এই সময়গুলো মানুষকে বোঝাতে পারছে, কোনো দোষ ছাড়াই বন্দি চিড়িয়াখানার পশুপাখির কষ্ট। গৃহবন্দিকালীন এই সময়ে বাবা-মা, ছোট ভাই-বোনদের সঙ্গে সময় দেওয়া, পাশাপাশি ছোটখাটো কাজে বাবা-মাকে সাহায্য করে এক স্বর্গীয় আনন্দ পাচ্ছি। বই পড়া, স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের জন্য ইবাদত, নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করছে। বাড়িতে এসে একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে থাকলেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সিরিজ, গল্প, উপন্যাস পড়ে এবং নানান জাতের শাকসবজি চাষ করে সময়গুলো দিব্যি কেটে যাচ্ছে। এতকিছুর মাঝেও মিস করছি প্রিয় ক্যাম্পাসের রঙিন দিনগুলো, মিস করছি ক্যাম্পাসের হল জীবন। মিস করছি প্রিয় কাছের মানুষদের। অতি ক্ষুদ্র অদৃশ্য এই জীব মহান স্রষ্টার উপস্থিতি আর ক্ষমতার জানান দিচ্ছে। তবে প্রার্থনা এটাই, এই ঘোর অমানিশা দ্রুত কেটে যাক। কেটে যাক মানুষের হানাহানি, হিংসাবিদ্বেশ। পৃথিবী ফিরে পাক নতুন জীবন, মানুষ ফিরে যাক জীবনের স্বাভাবিক গতিধারায়। ধরিত্রী হয়ে উঠুক সুন্দর ও মানবিক।
শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিকল্প নেই
—আয়াতুল্লাহ সিদ্দিকী
ইসলামী ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজ, রাজশাহী
করোনা প্রাদুর্ভাবের ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের মাঝেও দিনের একটি অংশজুড়ে কলেজের পক্ষ থেকে নেওয়া হচ্ছে অনলাইন ক্লাস, যা পড়াশোনার গতি ধরে রাখতে বেশ উপযোগী ভূমিকা রাখছে। এর বাইরে বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে যেমন-পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। বাবা-মাকে নানা কাজে সাহায্য করা। ছোট ছোট ভাইবোনদের লেখাপড়ায় সাহায্য করা। বিভিন্ন ত্রাণকার্যে অংশ নেওয়া, ধর্মীয় কাজ ও বই পাঠ করে সময় কাটছে। বর্তমানে যে সামাজিক দুরবস্থা সৃষ্টি হয়েছে এতে নিজের পরিবারকে নিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার কোনো বিকল্প নেই। এতে পরিবারের তরুণ সদস্যরা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমি মনে করি। করোনার প্রভাবে শিক্ষা খাতসহ অন্যান্য খাতে যে ক্ষতি লক্ষণীয়, তা পুষিয়ে নিতে সরকারি সিদ্ধান্ত ও নীতিমালার দিকে তাকিয়ে রয়েছে দেশবাসী। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্সবকালীন ছুটিসহ আনুষঙ্গিক ছুটি কমিয়ে আনার একটি পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই সরকার নিয়েছে, যা অবশ্যই প্রসংশনীয়। সর্বোপরি, একটি সুস্থ পরিবেশে আবার ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে যেতে পারাটাই সবার কাম্য।
