মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলীয় পদপ্রার্থী জো বাইডেন বেশ ভালো মুডে আছেন। যদিও এখন জুলাই মাস নির্বাচন হবে নভেম্বরে মনে হচ্ছে যেন নির্বাচনে জেতার জন্য তার কোনো তাড়া নেই।
জনমত জরিপগুলোতে সুবিধাজনক অবস্থানে বাইডেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে তুলনা করা শুরু করেছেন। ১৯৮০ সালের নির্বাচনে কার্টার রোনাল রিগ্যানের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে গিয়েছিলেন। ট্রাম্পকে নিয়ে এ ধরনের মূল্যায়নের কারণ এখন দেশটিতে দুটো বড় সমস্যা। একটি হলো করোনা মহামারি অপরটি জাতিগত বা বর্ণবাদী উত্তেজনা। কোনো ইস্যুতেই ট্রাম্প বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারেননি বলে অনেকে মনে করেন। রিপাবলিকানদেরও অনেকে বলছেন একাধিক সমস্যা মোকাবিলায় ট্রাম্প পারদর্শী নন। ট্রাম্পের আচরণ দেখেও মনে হয় না তিনি পুনর্নির্বাচনে লড়তে যাচ্ছেন। রিপাবলিকান শিবিরে স্পষ্ট হতাশার ভাব।
ট্রাম্পের হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা দেখে ডেমোক্র্যাটরা যদি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে সেটি তাদের জন্য কাল হতে পারে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি যাই করুন না প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে তিনি যে দক্ষতা স্বীকার করতেই হবে। বলা যায় ম্যাকিভিলিয়ান নীতির তিনি একজন সার্থক প্রয়োগকারী। গতবারের নির্বাচনে তিনি যেভাবে এই কৌশল খাটান সেটি ডেমোক্র্যাটদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে যেমন তেমনি নিজ দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তিনি একইভাবে ঘায়েল করে নিজের মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। ডেমোক্র্যাটদের জন্য গা ছাড়া ভাব দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। ৪ জুলাই স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে মাউন্ট রাশমোরে দেওয়া ট্রাম্পের ভাষণের কথাই ধরা যাক। এ ভাষণে তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের পক্ষে আন্দোলনকারীদের প্রতি মোটেই নমনীয় হননি। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ট্রাম্প সম্প্রতি আন্দোলন সম্পর্কে বলেন, ‘আমাদের ইতিহাস, বীরদের কীর্তি, মূল্যবোধ ও নতুন প্রজন্মের দীক্ষার প্রতি এ এক নির্মম আঘাত’। তিনি অতীত গৌরবের ওপর জোর দিয়ে বলেন, আন্দোলনকারীদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এ হলো সোজা কথায় একচ্ছত্রবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, তথাকথিত বাম ঘেঁষা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মূল লক্ষ্য যে আমেরিকার মূল সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা সেটি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে।’ স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন সাউথ ডাকোটার মাউন্ট রাশমোর ন্যাশনাল মেমোরিয়ালে তিনি এই ভাষণ দেন। আন্দোলনকারীদের একহাত দেখে নিলেও ট্রাম্প পূর্বসুরি লিঙ্কন, ওয়াশিংটনসহ অন্য নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর টামি ডাকওয়ার্থ ট্রাম্পের ঐ ভাষণ সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, তিনি ‘অতীতের বিশ্বাসঘাতকদের’ প্রশংসা করেছেন। কনফেডারেট ভাস্কর্য ও সামরিক ঘাঁটির নাম কনফেডারেট জেনারেলদের নামে রাখার পক্ষে ট্রাম্প যে যুক্তি দেখিয়েছেন ডাকওয়ার্থ তারও সমালোচনা করেছেন। মাউন্ট রাশমোর যুক্তরাষ্ট্রের একটি ন্যাশনাল মনুমেন্ট। জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস জেফারসন, থিয়োডর রুজভেল্ট এবং আব্রাহাম লিঙ্কন এই চার সাবেক প্রেসিডেন্টের মুখমণ্ডল খোদিত রয়েছে এই পাহাড়ে। জাতীয় মনুমেন্ট হওয়া সত্ত্বেও এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। জায়গাটি আমেরিকার আদিবাসীদের মালিকানাধীন ছিল। এটি জোর করে দখল করা হয়েছে বলে কৃষ্ণাঙ্গ ও আদিবাসীরা অভিযোগ করে থাকে। ডাকওয়ার্থ তার মন্তব্য সে প্রসঙ্গটিও তোলেন। ২৫ মে মিনিয়াপেলিসে পুলিশ হেফাজতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর বর্ণবাদ এখন মার্কিন রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যু। উল্লেখ্য ডাকওয়ার্থ জো বাইডেনের পছন্দের ভাইস প্রেসিডেন্টের তালিকায় রয়েছেন। থাইল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী ডাকওয়ার্থ রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে পেশায় ছিলেন সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার পাইলট। ২০০৪ সালে ইরাকে মিলিশিয়া হামলায় তিনি দুই পা হারান। তিনি ঐ বিবৃতিতে বলেন, সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি মার্কিন মূল্যবোধগুলো ক্লেদমুক্ত করতে চান। যেসব মূল্যবোধের ওপর দেশটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ট্রাম্পের কথায় আসা যাক। তিনি স্পষ্টত বলেছেন, ‘আমরা এক সাংস্কৃতিক যুদ্ধের মধ্যে আছি।’ উদ্দেশ্য ডেমোক্র্যাটদের বামপন্থি ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া। বাইডেনের মনোনয়ন প্রতিদ্বন্দ্বী নিজ দলের বার্নি স্যান্ডার্স বামপন্থি পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। বিষয়টি ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে সুযোগ এনে দিয়েছে। বাইডেন অবশ্য বামপন্থি, কনফেডারেট স্ট্যাটাস, মনুমেন্ট এবং ফাউন্ডিং ফাদার্স নিয়ে খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখাননি। তবে ফক্স নিউজের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্রিট হিউম মনে করেন, স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ নিয়ে ডাকওয়ার্থ মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ট্রাম্প যদি একে নির্বাচনি রাজনীতিতে কাজে লাগাতে পারেন তবে তিনি অনেক সুবিধা করবেন। তবে অনেক বিশ্লেষক এটাও মনে করেন যে ট্রাম্প যেভাবে কট্টর ডানপন্থি হয়ে যাচ্ছেন সেটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধ জয় কঠিন করে তুলবে।
