টাঙ্গাইলের মধুপুরে একই পরিবারের ৪ জন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কমপক্ষে পাঁচজন জড়িত ছিল। এরা সবাই মাদক ব্যবসায়ী নয়তো মাদকসেবী। তবে কেউ পেশাদার খুনি বা দাগী অপরাধী বলে মনে হচ্ছেনা। ঘটনার নেপথ্যে ছিল সুদ আর মাদক ব্যবসা। এমন ধারনা দিয়েছেন তদন্তের দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, গত বুধবার মধুপুর পৌরশহরের যে মহল্লায় একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যার ঘটনা ঘটে সেই মাস্টারপাড়া বহু আগে থেকেই মাদক, ছিনতাই ও অসামাজিক কাজের হটস্পট হিসাবে কুখ্যাত। ঘরের ওপর ঘর, যাতায়াতের রাস্তা মানে গলি গুপচির পায়ে হাটা পথ, ড্রেন না থাকায় জলকাদায় একাকার বস্তিসদৃশ এক ঘিঞ্জি এলাকা। সন্ধ্যার পর রাস্তায় কোন বাতি নেই। তাই গিজগিজে অন্ধকার পাড়ায় সন্ধ্যার পর মাদক ব্যবসায়ী আর মাদকসেবীদের হাট বসে। ছিনতাইকারীর অভয়ারণ্য এ পাড়ায় সন্ধ্যার পর কোন রিকশা প্রবেশ করতে চায়না। অসামাজিক কাজের জন্যও পাড়ার কুখ্যাতি রয়েছে। মাদক, ছিনতাই ও অপরাধ সংঘটনের এমন হটস্পটেই গত বুধবার রাতে লোমহর্ষক ৪ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
আইনশৃ্খংলা বাহিনীর কর্মকর্মতারা মাদকের এ ঘাটির সত্যতা স্বীকার করে জানান, নৃশংস খুনের সাথে শুধু সাগর আর জোয়াদ আলী নয়, কমপক্ষে পাঁচজন জড়িত ছিল। এদের মধ্যে খুনের মাস্টারমাইন্ড সাগর ও জোয়াদ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। জোয়াদকে আজ সোমবার টাঙ্গাইল আদালতে চালান দিলে তিন দিনের রিমান্ডে দেওয়া হয়। অপরদিকে সাগরকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আজ সোমবার দুপুরে মধুপুর থানা পুলিশের নিকট হস্তান্তর করে র্যাব।
আরও পড়ুন: নরসিংদীতে বন্যার পানি বৃদ্ধির সাথে ব্যাপক নদী ভাঙন
মামলার তদন্তকারী অফিসার ওসি (তদন্ত) ছানোয়ার হোসেন জানান, আগামীকাল মঙ্গলবার সাগরকে টাঙ্গাইল আদালতে পাঠিয়ে কয়েকদিনের রিমান্ড চাওয়া হবে।
মধুপুর থানার ওসি তারিক কামাল জানান, জোয়াদ মাদক ব্যবসায়ী। সাগর মাদকাসক্ত। অন্যান্য যারা খুনের সাথে জড়িত রয়েছেন তারাও কমবেশি মাদক ব্যবসা অথবা নয়তো মাদক সেবনের সাথে জড়িত। পুরো গ্যাং পাকড়াও করার জন্য অভিযান চলছে। দুই একদিনের মধ্যে সবাইকে আটক করা সম্ভব হবে।
মধুপুর পৌর শহরের মাস্টারপাড়া মাদক ও অপরাধের ঘাটি, এমন অভিযোগ স্বীকার করে ওসি জানান, পুলিশ ও র্যাব বিভিন্ন সময়ে এখানে অভিযান চালিয়ে অনেককে গ্রেফতার এবং মাদক উদ্ধার করেছে। কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে এ পাড়া থেকে মাদক একবারে নির্মূল করা হবে।
নাম প্রকাশে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নিহত গনি সুদের ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল। খুনের মাস্টারমাইন্ড সাগর ঘটনার আগের দিন সুদে টাকা ধার চাইতে গেলে গনি তাকে টাকা না দিয়ে গালিগালাজ করে। উল্টো সাগরের স্ত্রীকে অসামাজিক কাজে নামার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে সাগর ভয়ানক ক্ষুব্দ হয়।
মধুপুর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার কামরান হোসেন জানান, সুদের দেনা-পাওনা এবং দুইশ টাকা ধার না পেয়ে সাগর আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল। এমতাবস্থায় গনিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। এরই অংশ হিসাবে তার ৫-৬ জন সহযোগীকে নিয়ে সে খুনের অভিযানে নামে। স্থানীয় বাজার থেকে সে চেতনানাশক স্প্রে সংগ্রহ করে। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে গনির বাড়িতে প্রবেশ করে। প্রথমেই আব্দুল গনিকে অজ্ঞানের পর জবাই করে। সাগরের আক্রোশ ছিল শুধু গনির ওপর। কিন্তু গনিকে হত্যার পর সঙ্গী-সাথীরা সহজেই লুটপাটের জন্য বাসার সবাইকে চেতনানাশক স্প্রে করে অজ্ঞানের পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুন করে। পরে নগদ টাকা ও মালামাল লুট করে ঘর ও বাসার গেটে তালা লাগিয়ে সটকে পড়ে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার রাত দশটার পর টাঙ্গাইলের মধুপুর পৌর শহরের মাস্টার পাড়া বাসায় উসমান গনি ওরফে আব্দুল গনি সপরিবারে খুন হন। দুদিন পর গত শুক্রবার সকালে মধুপুর থানা পুলিশ ৪ জনের লাশ উদ্ধার করে।
ইত্তেফাক/এএএম
