লিবিয়ায় ২৪ বাংলাদেশী খুন হবার পর পাচারকারীদের ধরতে পুলিশ মরিয়া হয়ে উঠেছে। সরকার এবং পুলিশের শীর্ষ মহলের নির্দেশে বিষয়টি অগ্রাধিকার তদন্ত করছে পুলিশের বিশেষ শাখা সিআইডি। পাচারকারীদের উত্স খুঁজে বের করার জন্য সংস্থাটির কর্মকর্তারা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। মানব পাচারের সাথে সামান্যতম সংশ্লিষ্টতা আছে এমন কেউই বাদ যাচ্ছে না তাদের তদন্ত থেকে। ইতিমধ্যে এ কাজে বেশকিছু অগ্রগতিও হয়েছে। বিভিন্ন উত্স থেকে পাওয়া তথ্যগুলো তারা মিলিয়ে নিচ্ছেন। সিআইডির সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মানব পাচারের সাথে জড়িত চক্রটিকে চিহ্নিত করার কাজটি তারা দ্রুতই সেরে ফেলতে পারবেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাচারের সংগে সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করতে জাল বিস্তৃত করা হয়েছে। অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে বেশকিছু তথ্য বেরিয়ে আসছে। তথ্য মিলিয়ে নেয়ার কাজও চলছে।
উল্লেখ্য, গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে লিবিয়ার মিসরাতায় পাচারকারীদের হাতে ২৪ বাংলাদেশীসহ ৩১ হতভাগ্য খুন হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব জায়গায় বিষয়টি তুমুল আলোচিত হয়।
এদিকে বাংলাদেশ থেকে মানবপাচার নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে একাধিক পক্ষের সাথে কথা বলা হয়েছে। তাঁরা জানান, সাধারনত: যাদের পাচার করা হয় তাদেরকে দুই উপায়ে বিদেশ পাঠানো হয়। এদের অনেকে যান ওয়ার্ক পারমিটে আবার কেউ যান ভিজিট ভিসায়। যারা ওয়ার্ক পারমিটে যান তাদেরকে সরকারের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে অনাপত্তিপত্র নিতে হয়। এরপর তারা সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স থেকে টিকিট কাটেন। টিকেট কাটার সময় সকল ট্রাভেল ডুকুমেন্ট প্রদর্শন বাধ্যতামুলক হলেও কোন কোন ট্রাভেল এজেন্সি এর ব্যত্যয় ঘটিয়েছে বলে সিআইডির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। এজন্য তারা ইতিমধ্যে এসব ট্রাভেল এজেন্সি এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। পাচারের শিকার হয়ে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের টিকিট কারা বুকিং করেছে বা অর্থ পরিশোধ করেছে তাদেরও খোঁজা হচ্ছে।
জানা যায়, টিকিট কাটার পর সংশ্লিষ্টরা বিমানবন্দর গিয়ে চেক-ইন কাউন্টারে গিয়ে বোর্ডিং পাস নেন। এক্ষেত্রেও বেশকিছু নিয়মকানুন থাকলেও কিছু এয়ারলাইন্স এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে না। বোর্ডিং পাস নেয়ার আগে চেক-ইন লিস্টে যেসব তথ্য চাওয়া হয় সেগুলো সরবরাহ করা না হলেও অনেককে বোর্ডিং পাস দিয়ে দেয়া হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে অধিকাংশ এয়ারলাইন্সের পক্ষে বাংলাদেশ বিমান চেক-ইন এর কাজটি করে থাকে। উন্নত দেশের অনেক বিমানবন্দরে ই-চেক ইনের ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি। তবে বাংলাদেশে এখন ওয়েব থেকে টিকেট কাটা এবং ওয়েব চেক-ইনের ব্যবস্থা আছে। এক্ষেত্রে যাত্রীকে চেক-ইন কাউন্টাওে যেতে হয়না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পাচারের উদ্দেশ্যে যাদের বিদেশ নেয়া হয় তারা যে ভিসায় যান না কেন সেখান থেকে অন্য দেশে চলে যান। তবে সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, পাচারের উদ্দেশ্যে যাদের নেয়া হয় তারা ওয়ানওয়ে(একমুখী) টিকেট কেটে বিদেশে যান। আবার অনেকে রিটার্ন টিকিট নিয়ে যান। এক্ষেত্রে যারা অসত্ উদ্দেশ্যে বিদেশ যান তাদের একমুখী টিকেটের টাকা গচ্ছা যায়। পাচারকারীরা বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্টের কাছ থেকে যেসব টিকিট কিনেছে সেসব কেনার ক্ষেত্রে নিয়মের কোন ব্যত্যয় হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে সিআইডি।
এ বিষয়ে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, মানব পাচারের বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আমরা বিচ্ছিন্নভাবে কাজে করেছি। কিন্তু লিবিয়ায় এতবড় ঘটনার পর আমরা সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছি। ইতিমধ্যে বেশকিছু তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। তিনি বলেন, দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি, এয়ারলাইন্স, ট্রাভেল এজেন্সি যারাই জড়িত থাকুক তাদের আমরা খুঁজে বের করবো।
এদিকে অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, একসময় একটি বিদেশি এয়ারলাইন্সে করে পাচারকারীরা কেনিয়ার নাইরোবি হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় লোক পাচার করতো। নাইরোবিতে অন অ্যারাইভাল ভিসার ব্যবস্থা থাকায় এ কাজটি তাদের জন্য সহজ হতো। কিন্তু ওই এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তারা পাচারকারীদের সন্দেহ করে টিকিট ইস্যু বন্ধ করে দেয়। এরপর পাচারকারীদের পক্ষ থেকে ওই এয়ারলাইন্স কর্মকর্তাদের হুমকি দেয়া হয়। জানা গেছে, ওই পাচারকারীরা এখনো নির্বিঘ্নে পাচারের কাজটি পরিচালনা করছেন। তারা ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের অফ-লাইন জিএসএ নিয়ে ভারত দিয়ে মানুষ পাচার করছে বলে জানা গেছে। সাধারনত: বাংলাদেশে যেসব এয়ারলাইন্স আসে না সেগুলোর জন্য অফ-লাইন জিএসএ নিতে হয়।
