মোস্তফা রনি
একটি শিশুর জন্ম থেকে বিকাশ, প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্যরক্ষা ও রোগব্যাধি থেকে সুরক্ষার জন্য দুধ অপরিহার্য। একটি সবল ও শক্তিমান জাতি গঠনের জন্য দুধের বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের মেধা গঠনে দুধের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। এদিকে, বর্তমান আতঙ্কের আরেক নাম করোনা ভাইরাস। যার থাবায় বিশ্বে প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। আর এটা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ব্যক্তিগত সচেতনতা গড়ে তোলা ও শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে। আর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রতিদিন প্রয়োজন বেশি পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া। অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হলো কিছু ভিটামিন, মিনারেল ও এনজাইম, যা শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালের (দেহের কোষ, প্রোটিন ও DNA ক্ষতি করে এমন কিছু) বিরুদ্ধে লড়াই করে। এটি শরীরের কোষগুলোকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচিয়ে শরীরে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে।
প্রধান অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো হলো—বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন এ, সি, ই, লাইকোপেন, লুটেইন সেলেনিয়াম। যার বেশির ভাগ উপাদান রয়েছে দুধে। দুধ রোগপ্রতিরোধ শক্তি বাড়িয়ে দিয়ে শরীরকে রোগমুক্ত রাখে।
যতই গুণগান হোক, দুধের মান অনেক বড় ফ্যাক্টর। বিএসটিআই যেসব অনুমোদিত উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্যের গুণমান পরীক্ষা করে সেসব উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পাস্তুরিত দুধ ব্যতীত খোলা বাজারে বিক্রি করা কাঁচা দুধ মোটেই নিরাপদ নয়। রাজধানীতে দেখা যায়, প্রচুর অপাস্তুরিত খোলা দুধ পলিথিনে বা বোতলে ভরে বিভিন্ন বাসায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এ নিয়ে ভোক্তাদের সতর্কতা, সচেতনতা খুব দুর্বল। তাছাড়া খোলাবাজারের এসব প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই কর্তৃক অনুমোদিত নয়। এরা সরকারিভাবে কোনো নিবন্ধন না নিয়েই জনসাধারণকে ভেজাল ও ক্ষতিকারক দুধ দিচ্ছে। আবার অসাধু কিছু ব্যবসায়ী বাজারে ইদানীং হোয়ে পাউডার, ভেজিটেবল ফ্যাট বা রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে মারাত্মক ক্ষতিকর কৃত্রিম দুধ তৈরি ও বিক্রি করছে। খোলা অপাস্তুরিত দুধের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। এর পেছনে দায়ী আমাদের অজ্ঞানতা, অসচেতনতা।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত—গত বছরের এক পরীক্ষায় দেখা যায়, খামারের খোলা বাজারজাতকৃত দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯ শতাংশ দুধে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কীটনাশক, ১৩ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিন, ১৫ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় সিসা পাওয়া গেছে। আর ৯৬ শতাংশ দুধে মিলেছে বিভিন্ন অণুজীব। গরুর খোলা দুধে অণুজীবের সহনীয় মাত্রা সর্বোচ্চ ৪ থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে ৭.৬৬ পর্যন্ত। আফলাটক্সিনের সহনীয় মাত্রা ০.৫ হলেও রয়েছে ০.৯৯৬ মাত্রা। টেট্রাসাইক্লিনের মাত্রা ১০০ পর্যন্তু সহনীয় হলেও ৬৭১.১৩, সিপ্রোফ্লোক্সাসিনের মাত্রা ১০০ পর্যন্ত সহনীয় হলেও ১৪৮.৩৬, কীটনাশকের মাত্রা ৫ সহনীয় হলেও পাওয়া গেছে ৯.৫০-১৬.২০ পর্যন্তু। আমদানিকৃত প্যাকেটজাত দুধের ক্ষেত্রে এই উপাদানের মাত্রা ৭১৭.৮২ পর্যন্তু পাওয়া গেছে। আর আফলাটক্সিনের সহনীয় মাত্রা ০.৫ হলেও পাওয়া গেছে ১.৯৩ পর্যন্তু।
খোলা দুধে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হবে এটা স্বাভাবিক ঘটনা। কারণ এ দুধ দীর্ঘ পথে পরিবহন ও দীর্ঘসময় খোলাভাবে সংরক্ষণ করা হয়। ভোক্তাদের কাছে অপাস্তুরিত দুধের মান তাত্ক্ষণিক পরীক্ষার কোনো প্রযুক্তি হাতে নেই, অথচ তা সুদৃশ্য মোড়কে করে বিক্রি হচ্ছে। তবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে পাস্তুরিতকরণের মাধ্যমে এসব ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নির্মূল করা সম্ভব হয় বলে উন্নত বিশ্বে তরল দুধ হিসেবে শুধু পাস্তুরিত এবং ইউএইচটি দুধই বাজারজাত করা হয়ে থাকে। শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ, রোগীসহ সবার সুস্বাস্থ্যের জন্য চাই নিরাপদ ও সঠিক মানের তরল দুধ।
n লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও শিক্ষক
