দুনিয়াব্যাপী প্রভাব-বিস্তারী প্রবাদপ্রতিম কথাসাহিত্যকের তালিকায় নানা বিবেচনায় আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ের (১৮৯৯-১৯৬১) নাম উপরের দিকেই থাকবে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ ব্যতিক্রধর্মী অনন্য বৈশিষ্ট্যগুণে চিরায়িত সাহিত্যের মহিমা অর্জন করেছে। প্রেম-অপ্রেম, হার না-মানা জীবন-সংগ্রাম, বন্যতা, রিরংসা, ক্ষয়-অক্ষয়, জীবনের সদর্থকতার সন্নিবেশের কারণে তাঁর রচনাসমূহ পাঠককুল লুফে নিয়েছে। বিশেষ করে, যুদ্ধের নিঃসীম ভয়াবহতা এবং যুদ্ধপরবর্তী সাফল্যের বিজয়গাথা বা ব্যর্থতাদীর্ণদাহ-প্রদাহজনিত হতাশা ও নিঃসঙ্গ-নিগূঢ়তাকে জীবন্তরূপে ভাষারূপ দিতে তিনি অতুলনীয় সৃষ্টিক্ষমপ্রজ্ঞার প্রমাণ প্রকীর্ণ করেছেন। এ কারণে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে, বিশেষ করে ওয়ার রাইটিংস বা যুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে- তিনি মহত্ শিল্পী ও স্রষ্টারূপে আদৃত।
বিরলপ্রজ সাহিত্যক হয়েও হেমিংওয়ে ছিলেন স্বল্পপ্রজদের দলভুক্ত। তিনি মাত্র দশটি উপন্যাস, দশটি ছোটগল্প সংকলন, পাঁচটি নন-ফিকশন, ৮৮টি কবিতা এবং একটি নাটক ও দুটি ভ্রমণকাহিনির রচয়িতা। কার্যত অ্যাডভেঞ্চার ও রোমাঞ্চপ্রিয় হেমিংওয়ের জীবনের নানাপ্রান্ত থেকে আহরিত ও লব্ধ অভিজ্ঞতার নির্যাস হল তাঁর রচনাসমূহ।
স্বচ্ছল চিকিত্সক পিতা ক্লোরেন্স অ্যাডমণ্ডস হেমিংওয়ে আর মঞ্চ মাতানো গায়িকা মাতা গ্রেস হলের সন্তান শিশু ‘পাপা’ বিদ্যালয়ে পাঠগ্রহণ কালে মুষ্টিযুদ্ধ, র্ট্যাক অ্যান্ড ফিল্ড, ওয়াটার পোলো, ফুটবল ইত্যাদি খেলায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। বাবা তাঁকে নিজের মত করে শিকারি বিদ্যা রপ্ত করান; আর মা তালিম দেন বাদ্যযন্ত্রের বাহারি কৌশলসহ সংগীতবিদ্যার। স্কুলের দেয়াল পত্রিকা ‘ট্রাপিজি’তে প্রকাশের জন্য জীবনে প্রথম লেখেন। ১৭ বছর বয়সে ১৯১৬ সালের জানুয়ারিতে তাঁর লেখা প্রথম প্রকাশিত হয়। বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালেই তাঁর সাংবাদিকতারও হাতেখড়ি। উচ্চমাধ্যমিক শেষে তিনি সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর রেডক্রসের গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। মর্টারের শেলে আহত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালের বিছানায় কাটাতে হয়। সেখানেই উনিশ বছর বয়সে প্রেমে মজেন ছাব্বিশ বছর বয়সী সেবা-শুশ্রষায় নিয়োজিত অন্তঃপ্রাণ-সুশ্রী-সেবিকা এগনেস ভন কুরভস্কির। এ ভিনদেশি প্রেমিকা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ইতালীয় এক অফিসারের সঙ্গে বিয়ের পিরিতে বসে। ফলে হেমিংওয়ের প্রথম প্রণয় পরিণয়ে গড়ায়নি। এরপর শিকাগোতে থাকাকালীন তাঁর থেকে আট বছরের বড় রুমমেটের বোন হ্যাডলি রিচার্ডসনের প্রেমে পড়েন। ১৯২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁরা বিয়ে করেন। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত তৃপ্ত হয়নি। কোন একটা যাতনা বা অপ্রাপ্তি তাঁকে তাড়িত করে।
পলিন ফাইবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের গোপন প্রেমের কথা অবহিত হয়ে হ্যাডলি নিজেকে সসম্মানে গুটিয়ে নেন। ১৯২৭ সালে তিনি পলিন ফাইবারকে বিয়ে করেন।
ফাইবারে মজে থাকা অবস্থায় ১৯৩৯ সালে হেমিংওয়েরসাথে মার্থা গেল হর্নের পরিচয় ঘটে এবং ১৯৪০ সালে মার্থাকে তিনি বিয়ে করেন। সর্বশেষ ১৯৪৪ আবার তিনি মেরি ওয়েলসের সঙ্গে সমপর্কে জড়ান এবং বিয়ের পিড়িতে বসেন। তিনি এভাবে বার বার প্রেমে পড়েছেন। এর অনিবার্য পরিণতিরূপে তাঁর জীবনে উপর্যোপরি বিচ্ছেদ এবং পুর্নবিয়ের ঘটনা ঘটে।
উত্তরাধিকারসূত্রে বন্যপ্রাণী ও মাছ শিকারের আসক্তি তাঁর রক্তে মিশে ছিল। বন্ধুদের সমভিব্যাহারে একটানা দীর্ঘ দিন ধরে শিকার ও ক্যাম্পে মত্ত থেকেছেন। বহুদেশ ভ্রমণ করেছেন। হ্রদ, নদী ও সমুদ্রউপকূলে বসবাসরত পেশাজীবী জেলেদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশেছেন। সমুদ্র অভিযান নিরাপদ ও সহজলভ্য করার জন্য নিজে নৌকা কিনেছেন। অগণিতবার ছোট, মাঝারি এবং প্রকাণ্ড রকমের মাছ শিকার করেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রেডক্রসের হয়ে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অন্তরালে বিশেষ গোপনীয়তায় হিসাববিহীন জ্বালানিসহ মাসিক এক হাজার ডলারের বিনিময়ে মার্কিনীদের পক্ষে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে ব্যতিব্যস্ত থেকেছেন। অন্যদিকে চে গুয়েভার ও ফিদেল ক্যাস্ত্রোর বামরাজনীতিকে সমর্থন করেছেন।
প্রেমিকাকুল, শিকারজীবন যুদ্ধকাণ্ডে নিয়োজিত নানা শ্রেণি পেশার মানুষ, অন্ত্যজশ্রেণির নিম্নবর্গের ক্ষুন্নবৃত্তি-পেশাজীবী সমপ্রদায়ের সঙ্গে মিশেছেন। এর বাইরে ইয়েটস, ফোর্ড ম্যাডক্স ফোর্ড, ডরম্যান স্মিথ, হেনরি সেরানো ভিলার্ড, শেরউড অ্যান্ডারসন, ম্যাক্স পার্কিনস, এজরা পাউণ্ড, জেমস জয়েস, পাবলো পিকাসো, জোয়ান মিরো, গ্রিস, গারট্রড স্ট্রেইন-এর মত জগেসরা কবি, লেখক, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞদের অন্তরঙ্গ একান্ত সান্নিধ্য দ্বারা তিনি তাঁর মানসগঠন, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে ঋদ্ধ করেছেন। কেউ কেউ প্রচণ্ডরকম অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন; আবার এজরা পাউণ্ডের মতো কেউ কেউ তাঁকে মইয়ের উপরে উঠতে উদারহস্ত প্রসারিত করেছেন। মূলত এতসব রকমারি কূলপ্লাবি অভিজ্ঞতা হেমিংওয়েকে নিজের মতো করে একটি আলাদা শিল্পীর ভুবন তৈরিতে প্রাণিত করেছে। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী লেখক জীবনে নিঃসন্দেহে তাঁর সেরা সৃষ্টি ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ (১৯৫২)। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া বুড়ো সান্তিয়াগোর জীবনের সংগ্রামী কাহিনির সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের সূক্ষাতিসূক্ষ গীতল বর্ণনাপাঠককে নিদারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। মানুষ কী করতে পারে এবং তার অব্যাহত- অবিরত লেগে থাকার শক্তি কত ভয়ঙ্কর রূপ পরিগ্রহ করতে পারে তা সান্তিয়াগো চরিত্রের প্রেক্ষণবিন্দু দিয়ে প্রতীকায়িত হয়েছে। তথাপি সমুদ্রই এ উপন্যাসের নায়ক। এ গ্রন্থের জন্য হেমিংওয়ে পুলিত্জারসহ নোবেল পুরস্কারে বরিত হয়েছেন। উপন্যাসটি লেখা শেষ করে বন্ধুদের তিনি বলেছিলেন, এটিই আমার সারাজীবনের শ্রেষ্ঠতম লেখা।
এছাড়া ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’(১৯২৬), ‘ফর হুম দ্য বেল টোলর্স (১৯৪০), ‘ইনআওয়ার টাইম’ (১৯২৫), ‘ম্যান উইদাউট উইম্যান’ (১৯২৭), ‘উইনার টেক নাথিং’ (১৯৩৩) এবং ‘দ্য স্নোস অব কিলিমাঞ্জারো’ (১৯৬১) গ্রন্থ ছাড়াও রেঁস্তোরায় খেতে বসে বন্ধুদের সঙ্গে দশ ডলার বাজি ধরে টিস্যু পেপারে ছয় শব্দে লেখাসন্তানহারা মায়ের নির্বাক পাথুরে বেদনাকীর্ণ ভাষ্যের প্রতিবিম্বসদৃশ দুনিয়ার সবচেয়ে অতিকায়-ক্ষুদ্র গল্প ‘For sale.Baby shoes .Never worn’ সহ তাঁর প্রতিটি রচনাই এক একটা মাস্টার পিস। তাঁর কোন কোন গল্প ও উপন্যাস একান্তই আত্নজীবনী টাইপের। তাছাড়া প্রায় সব লেখার রসদ জীবন থেকে নেয়া। এজন্যই তা এত প্রাণ-প্রাচুর্যে পরিকীর্ণ।
ফলত আখ্যানকে টেনে ফুলে-ফেঁপে প্রলম্বিত করার পক্ষে তিনি ছিলেন না। ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যাণ্ড দ্য সি’-কে এক হাজার পৃষ্ঠায় রূপদানের রসদ তাঁর ছিল ; কিন্তু তিনি তা না করে এটিকে একাহারী গড়ন দিয়েছেন। এভাবে প্রতিটি ঘটনা, আখ্যান, কাহিনী ও গল্পের অস্থিমজ্জার অলিন্দে তিনি লীন হয়ে যেতেন। আবহ ও পরিবেশ-প্রতিবেশকে গভীর পর্যবেক্ষণ নিংড়ানো নিজের রোমাঞ্চপ্রিয় ভাবমূর্তি ও ভাবানুভূতির সংরাগে রঞ্জিত করতেন। বিপুলবিস্তারি ঘটনাপুঞ্জকে নিরেট ও নিটোল বুননে নির্মেদ ও নির্মোহ অবয়ব দিয়ে তাকে গুণগত মানে উন্নীত করতেন। মন্দ কে ভালো এবং অন্ধকারকে আলোতে রূপায়িত করতেন। কমা ও সেমিকোলন পরিহারপূর্বক আসন্নতাকে প্রকাশের অভিপ্রায়ে ‘এবং’ এর বহুল ব্যবহার তাঁর খুব প্রিয়রীতি ছিল। ছোট ছোট বাক্য গঠন এবং সহজ-সরল বোধগম্য শব্দরাজির প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি পাঠকসমাজকে উপন্যাস ও ছোট গল্পের অন্দরে নিমগ্ন রাখাতেন। এভাবে তিনি অনুসরণযোগ্য নিরাবেগী এক শিল্পশৈলী উপহার দিয়েছেন ।
বস্তুত এ অনুকরণীয় অভিনবত্ব ও নতুনত্বের গুণেই তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের মুখপাত্র হয়ে ওঠেন। তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও অমরত্ব কেবল কথাসাহিত্যের ভুবনে গণ্ডিবদ্ধ থাকেনি; বরং তাঁর নামে বস্ত্র, কলম, গ্রন্থ, গ্রহাণু, স্থান, চলচ্চিত্র, প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে। জনসংস্কৃতিতে এ শ্রদ্ধাঞ্জলি তাঁর প্রভাবের ব্যাপকতার প্রমাণ।
হেমিংওয়ে নিজের লেখনীশৈলীকে ‘আইস বার্গ তত্ত্ব’ অভিধা দিয়েছেন। এ তত্ত্বমতে মুখ্য বিষয়টি পানির ওপরে ভাসমান থাকে এবং গৌণ বিষয়গুলো দৃষ্টির বাইরে থাকে। অর্থাত্ এখনে কেবল নির্যাসটুকুই দৃশ্যযোগ্য হয়ে ওঠে। সমালোচক হেনরি লিস গেটস হেমিংওয়ের শিল্পশ্রীমণ্ডিত-স্বতন্ত্র এ ধরন ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি ও অন্যান্য আধুনিকতাবাদীগণ ঊনবিংশ শতাব্দীর লেখকদের বর্ণনাধর্মী ধরনের সৃষ্টি করেন; যেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অল্প বর্ণনা করে বা অল্প কিছু অংশ বিশদভাবে বর্ণনা করে সংলাপ, কার্য ও নৈঃশব্দের মাধ্যমে অর্থবোধক করে তোলে। তাঁর কর্মের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে সমালোচক বিগেল লিখেছেন, তাঁর সামগ্রিক কল্পকাহিনীতে তিনি মানুষের ভয়, অপরাধ, বিশ্বাসঘাতকতা, সহিংসতা, নিষ্ঠুরতা, মদ্যপান, ক্ষুধা, লোভ-লালসা, সমবেদনা, পরমানন্দ, স্নেহপরায়ণতা, ভালোবাসা ও কাম বিষয়ক সত্যতা উপস্থাপন করেছেন।’ হেমিংওয়ের লেখনীশৈলী নিয়ে গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেস লিখেছেন, তাঁর (হেমিংওয়ের) লেখা আপাতদৃষ্টিতে সহজ, সরল, স্পষ্ট, এমন কী নাটকীয় মুহূর্তেও প্রায় সমান নির্লিপ্ত। কিন্তু সাদাসিধে এ সাহিত্যের তল দেশে লুকিয়ে আছে এক উঁচু করে তুলে ধরা নিগূঢ় প্রজ্ঞা।
মূলত ‘A man can be destroyed but not defeated.’ আসলে মানুষ কখনো পরাজয় বরণ করে না, প্রয়োজনে লড়াই করতে করতে ধ্বংস হয়ে যায়। এই হার না- মানুষের লড়াই করে বাঁচার আশাবাদের মধ্যেই আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ভবিতব্যের লক্ষ্যাভিসারী অনতিক্রম ধ্রুপদী শিল্পশৈলী এবং জীবনবোধ নিহিত।
