করোনার টিকা ও ওষুধ পেতে বিশ্বব্যাপী গবেষণা

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২০, ২১:৩৭

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ এবং বিবেকসম্পন্ন সৃষ্টি আমরা মানুষ, আমাদের ইচ্ছেগুলো বরাবরই সৃষ্টির যাবতীয় শৃঙ্খলা ভেঙে অসীমকালের বুকে জেগে উঠেছে অবিন্যস্ত রহস্যেঘেরা বালুতটের ন্যায়। আর নিধুবন পেরুনো শঙ্কিত ছায়ার দাপটে চুরমার করেছে প্রকৃতির স্বরূপ। বিশ্বায়নের যুগে প্রকৃতিও নিজেকে মেলে ধরেছে, কোভিড-১৯ নামক মহামারির দৃঢ় আলিঙ্গনে স্তব্ধ করে দিয়েছে স্বার্থান্বেষী মানুষের ছুটে চলা বর্ণিল সময়। তবে বিশ্ব জুড়ে মহামারির এই সংকট মোকাবিলায় মানুষও থেমে নেই টিকা ও ওষুধ নিয়ে চালাচ্ছে জোরালো গবেষণা। করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে টিকা বা ওষুধ তৈরি কতটা দ্রুত হবে তা সঠিকভাবে বলা কঠিন। তবে ধারণা করা হচ্ছে তাতে এক-দেড় বছর সময় লেগে যাবে।

আসলে যে কোনো মহামারি প্রতিরোধে চিকিত্সাক্ষেত্রে প্রথমেই এগিয়ে থাকে টিকা আবিষ্কার করা। তাই অনেক দেশের গবেষক টিকা আবিষ্কার করে বিশ্বের মানুষকে করোনার থাবা থেকে বাঁচানোর উদ্দেশে শুরু থেকেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা যে বেশ সময়সাপেক্ষ তা সহজেই অনুমেয়? এছাড়া করোনা ভাইরাস নিরাময়ের ওষুধ আবিষ্কারের চেষ্টাও চালাচ্ছেন গবেষকগণ। প্রচেষ্টার লক্ষ্য হলো—প্রচলিত কোনো ওষুধ দিয়েই করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা করা। যেমন—ইবোলা বা এইডসের ওষুধ নির্দিষ্ট কিছু করোনা রোগীর ওপর প্রয়োগ করে সুফল পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হলেও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের রক্ত থেকে অ্যান্টিবডি (প্লাজমা) নিয়ে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। সুস্থ হয়ে ফেরা এই ব্যক্তিদের অ্যান্টিবডি আক্রান্ত রোগীর শরীরে প্রবেশ করালে ঐ শরীরে ‘প্যাসিভ ইমিউনিটি’ গড়ে উঠে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্যাসিভ ইমিউনিটি বিষয়টি সর্বপ্রথম ১৮৯০ সালে জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়। জার্মান ইমিউনোলজিস্ট, গণমাধ্যমে ‘শিশুদের ত্রাণকর্তা’ খ্যাত এমিল ফন বেরিং প্রথম ‘প্যাসিভ ইমিউনাইজেশন’ বিষয়টি উদ্ভাবন করেন। সেই সময় ডিপথেরিয়ার কারণে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হচ্ছিল। ফন বেরিংয়ের আবিষ্কারের কারণে ডিপথেরিয়া ও টিটেনাসে শিশুমৃত্যু অনেক কমে গিয়েছিল।

সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিনে অগ্রগামী প্রতিটি ভ্যাকসিনের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। চীন এখন পর্যন্ত অনেকটাই সফলতায় এগিয়ে। যুক্তরাজ্যের ভ্যাকসিন টাস্কফোর্সের প্রধান কেট বিংহ্যাম জানিয়েছেন, আগামী বছরের শুরুতেই এই ভ্যাকসিন হাতে পাওয়ার আশা করছেন তারা। করোনা মহামারি মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে এই ভ্যাকসিনই সবচেয়ে বড় অস্ত্র হবে বলে মনে করেন তিনি। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটির নেতৃত্বে আছেন অধ্যাপক সারাহ গিলবার্ট। তিনি বলছেন, ‘আমি আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই উন্নত ভ্যাকসিন তৈরি করা যাবে এবং এটি মানুষকে রক্ষা করবে।’ এছাড়া করোনা নিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন করে আশার আলো দেখাল মডার্ন। তারা জানায়, আগামী ২৭ জুলাই থেকে ৩০ হাজার মানুষের দেহে এই ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা চালাবে। অপরদিকে আগামী অক্টোবরের মধ্যেই এই পরীক্ষার ফলাফল জানা যাবে। এর আগে ভ্যাকসিনটির দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষায় যে ৬০০ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবী অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে অর্ধেকের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৫৫ এর মধ্যে। আর বাকিদের বয়স ছিল ৫৫ বছরের বেশি। এই ভ্যাকসিনটি দ্রুত গতিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দ্রুতগতি বা ‘ফাস্টট্র্যাক’ অনুমোদনের অর্থ হলো—টিকার অনুমোদনের প্রক্রিয়া সাধারণ সময়ের চেয়ে দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা।

সাধারণত, টিকা বিশ্বব্যাপী অনুমোদন, উত্পাদন এবং বিতরণ করতে কয়েক বছর, এমনকি কখনো কখনো কয়েক দশক সময় নেয়। সেই সুবাদে পরিসংখ্যান বলছে স্বাভাবিক অবস্থায় করোনার টিকা বা ওষুধ আবিষ্কারে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত লাগার কথা? কিন্তু প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে এখন তা কমানো সম্ভব। অন্যদিকে করোনার টিকা বা ভ্যাকসিন পেতে চিকিত্সক ও বিজ্ঞানীরা কঠোর ও দ্রুতগতিতে কাজ করে চলেছেন। সার্স-কোভ-২ প্রথম আবিষ্কার হওয়ার প্রায় ছয়-সাত মাস পরে এসে কমপক্ষে পূর্ণাঙ্গ তিনটিসহ মোট ছয়টি টিকার উন্নয়ন প্রকল্পের উত্সাহজনক অগ্রগতির খবর এরইমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। চড়াই উতরাই পেরিয়ে আরো অনেক প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে, যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস এরইমধ্যে দুই শতাধিক দেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, সারা বিশ্বে তৈরি করেছে ভয়াবহ সংকট। বিশ্ব জুড়ে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এই ভাইরাস থেকে মানুষকে বাঁচাতে এরই মধ্যে টিকা এবং ওষুধ আবিষ্কারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী, গবেষকগণ। ওষুধ কিংবা টিকা চলে এলেই করোনা নিয়ে ভয় হয়তো অনেকটাই কেটে যাবে; কেটে যাবে এই অন্ধকার। আর আলোকিত পাহাড়ের বুক থেকে তখন ভেসে আসবে হাসনাহেনা কিংবা মাধবীলতার সুবাসিত মোড়কে জড়ানো নতুন প্রহর।

n লেখক : কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও নারী নেত্রী