দেশের কয়েকটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। গতকাল শনিবার আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সীতাকুন্ড, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, পাবনা, নওগাঁ, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, ভোলা ও বরিশাল অঞ্চলসমূহের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা কিছু কিছু এলাকা থেকে প্রশমিত হতে পারে। এছাড়া সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে ও দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
এদিকে আজ রবিবার অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের কোথাও কোথাও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে। এছাড়া থাইল্যান্ড উপসাগর এবং তত্সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ‘পাবুক’ পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে আন্দামান সাগর ও তত্সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরও ঘনীভূত হয়ে উত্তর/উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
খুলনা অফিস জানায়, শৈত্যপ্রবাহের কারণে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে আড়াইশ’ শিশু খুলনা শিশু হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছে। রোগীর চাপে বেড ও কেবিন খালি না থাকায় ভর্তি বন্ধ করে শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রধান ফটকে বিজ্ঞপ্তি টানিয়েছে।
সূত্র মতে, গত মাসে একদফা এবং জানুয়ারির শুরুতেই শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের পিরোজপুর, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, নড়াইল, সাতক্ষীরা ও খুলনার বিভিন্ন উপজেলা থেকে শিশুরা নিউমোনিয়া ও সেপটিসেনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে খুলনা শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
খুলনা শিশু হাসপাতালের সূত্র জানায়, গত বছরের শেষ চার মাসের মধ্যে সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৩৭০ শিশু নিউমোনিয়া ছাড়াও ডায়রিয়া, জন্ডিস, কফ অ্যান্ড কোল্ড, ফেনিনজাইটিস, নিউমোনাইটিস ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে চিকিত্সা নেয়। সেপ্টেম্বর মাসেই মারা যায় ২৭ শিশু। অক্টোবরে ১ হাজার ৩৭৯ জন আক্রান্ত হয়, মৃত্যু ৪৭, নভেম্বরে ১ হাজার ৪২৭ জন আক্রান্ত হয়, মৃত্যু হয় ৬০ শিশুর, ডিসেম্বরে ১ হাজার ৪৩৭ জন আক্রান্ত হয়, মৃত্যু হয় ৬১ শিশুর।
হাসপাতালসূত্র জানান, শিশু হাসপাতালে বর্তমানে ৩৮টি কেবিন এবং অন্যান্য জরুরি চিকিত্সা বিভাগ ও ওয়ার্ড নিয়ে মোট ২৭০টি বেড রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে দু’ শতাধিক শিশু রোগী এখানে চিকিত্সাধীন। খুলনা শিশু হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে রোগীর চাপ কিছুটা বেশি। কেবিন বা বেড খালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার পূরণ হয়ে যায়। তারপরও সকল রোগীকেই সব ধরনের চিকিত্সা সেবা দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সম্প্রতি খুলনার সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম আব্দুর রাজ্জাক এক কর্মশালায় উল্লেখ করেন, জেলায় প্রতি হাজারে গত বছর গড়ে ১৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়। ২০২২ সালে প্রতি হাজারে মৃত্যুর সংখ্যা ১২-তে নামিয়ে আনতে হবে। মা ও শিশু মৃত্যুহার কমাতে হবে। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সুশান্ত কুমার রায় বলেন, শিশুর মৃত্যুর হার কমাতে স্বাস্থ্য বিভাগের অরগানগুলো কাজে লাগাতে হবে।
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলের ওপর দিয়ে এখন বয়ে যাচ্ছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। প্রতিদিনই বাড়ছে শীতের তীব্রতা। ঘন কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে চারদিক। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে চরম দুর্ভোগ। শীতকালীন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে হাড় কাঁপানো এই ঠান্ডায় ছিন্নমূল মানুষরা হয়ে পড়েছে অসহায়। বেলা বাড়ার পরও সূর্য উত্তাপ না ছড়ানোর কারণে কমছে না শীত।
আবহাওয়া অফিস বলছে, এমন অবস্থা বিরাজ করবে আরও কয়েকদিন। রাজশাহী আবহাওয়া অফিসসূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ মৌসুমে সর্বনিম্ন ৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল ২৯ ডিসেম্বর।
এ দিকে তাপমাত্রা কমতে থাকায় পদ্মাপাড়ের ছিন্নমূল মানুষগুলো শীতের তীব্রতায় কাবু হয়ে পড়েছে। উত্তরের হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বাতাসে স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সকালে ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে ভোরের সূর্যের দেখা মিললেও থাকছে না উত্তাপ। ফলে সন্ধ্যায় খোলা আকাশের নিচে থাকা শীতার্ত মানুষগুলোর শরীরে উষ্ণতা ছড়াতে খড়কুটো জ্বালাতে হচ্ছে। শীতে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়ছেন শিশু ও বৃদ্ধরা। তারা আক্রান্ত হচ্ছেন ঠান্ডাজনিত নানা রোগে। হাসপাতালে বাড়ছে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত নবজাতক শিশুর সংখ্যাও।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, কনকনে হিমেল হাওয়া ও কুয়াশার কারণে গাইবান্ধার সর্বত্র প্রচণ্ড শীত পড়েছে। ফলে জেলার গ্রামীণ জনপদ এবং যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও নদী তীরবর্তী এলাকার দুঃস্থ পরিবারগুলো গরম কাপড়ের অভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এই ঠান্ডার কবল থেকে বাঁচতে পুরাতন কাপড়ের দোকানগুলোতে ভিড় করছেন তারা। কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগে ব্যবসায়ীরা গরম কাপড়ের অস্বাভাবিক মূল্যও বৃদ্ধি করে দিয়েছে। ফলে দরিদ্র মানুষের পক্ষে শীতবস্ত্র সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। অথচ এখনো সরকারিভাবে শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু হয়নি। এদিকে এই শীতের কারণে সন্ধ্যার পর থেকেই শহরের রাস্তায় লোক চলাচল কমে যাচ্ছে। জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা ইদ্রিস আলীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত জেলায় ৪১ হাজার কম্বল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। যা বিতরণ চলমান আছে।
চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, চাটমোহরসহ চলনবিল অঞ্চলে শীতে বিপর্যস্ত মানুষ পুরাতন কাপড়ের দোকানে ভিড় করছেন। শীত নিবারণের জন্য দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা ছুটছেন পুরাতন কাপড়ের দোকানে।
চাটমোহর পৌর শহরের বালুচর, উপজেলা এলাকা, নতুন হাট, পুরাতন বাজার, রেলবাজার, বাসস্ট্যান্ড, ছাইকোলাসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে পুরাতন কাপড়ের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। অল্প দামে গরম কাপড় কেনার জন্য পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও ভিড় করছেন।
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার সর্বত্রই শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
গত কয়েক দিন যাবত্ শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকায় শীতে কাঁপছে সুন্দরগঞ্জবাসী। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে সর্বত্রই। এদিকে শীত নিবারণের জন্য গরম কাপড়ের দোকানগুলোতে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। অপরদিকে শিশু ও বৃদ্ধরা শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোলেমান আলী জানান, উপজেলায় শীতার্ত মানুষের জন্য ৬ হাজার ৫শ পিস কম্বল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ওই কম্বল বিতরণের জন্য সংশ্লিষ্ট ১৫ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
