রুদ্ধ হচ্ছে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স নেওয়ার পথ

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২০, ২২:২৫

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে এবার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভুয়া ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেওয়া ঠেকাতে নতুন করে ৯টি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত রপ্তানিকারক তথা ব্যবসায়ী উদ্যোক্তার বাইরে নামমাত্র পুঁজি কিংবা নামসর্বস্ব ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেওয়ার পথ রুদ্ধ হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি আদেশ জারি করার পর ইতিমধ্যে তা কার্যকর হয়েছে। এছাড়া এনবিআরের নতুন আরেকটি আদেশে আমদানিকৃত কাঁচামালের প্রাপ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত যুক্ত হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এতে জটিলতা বাড়ার পাশাপাশি সময়ক্ষেপণ হবে। ফলে ব্যবসা সহজ করার জন্য সরকারের উদ্যোগ (ইজি অব ডুয়িং বিজনেস) বাধাগ্রস্ত হবে।

আগে রপ্তানিকারকদের বন্ড লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম ও শর্ত অনেক শিথিল ছিল। ফলে অনেক নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান বন্ড লাইসেন্স নিয়ে অনিয়ম করত বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাতো, অন্যদিকে একই ধরনের পণ্য বেশি শুল্ককর পরিশোধ করে বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে লোকসান গুণতে হতো। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা এখনো চলমান। অনিয়ম ঠেকাতে গত কয়েক মাস ধরে কঠোর অবস্থান নেয় ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট অফিস। তা সত্ত্বেও অনিয়মকারীরা নানা উপায় খুঁজছে।

নতুন আদেশ অনুযায়ী বন্ড লাইসেন্স নেওয়া আবেদনকারী কোম্পানির ন্যূনতম মূলধন ১ কোটি টাকা হতে হবে। এছাড়া ব্যক্তি মালিকানা কিংবা অংশীদারির ক্ষেত্রে বার্ষিক বিক্রয় (টার্নওভার) অন্তত ৩০ লাখ টাকা হতে হবে। আগে বন্ড লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের আয়তনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও নতুন আদেশে তা গুদামসহ অন্তত ৫ হাজার বর্গফুট হতে হবে বলে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। পুরনো কিছু মেশিনপত্র দেখিয়েই বন্ড লাইসেন্স নেওয়া যাবে না।

স্থানীয়ভাবে পুরনো যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ ক্রয় করতে হলে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষা করিয়ে ঐ যন্ত্রপাতির ১০ বছর জীবনকাল রয়েছে বলে সনদ থাকতে হবে। ঐ যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট পরিশোধের প্রমাণ থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, ঐ যন্ত্রপাতির দর কোনোভাবেই ৪০ লাখ টাকার নিচে হতে পারবে না। প্রতিষ্ঠান ভাড়াকৃত স্থানে হলে পাঁচ বছরের ভাড়ার চুক্তি দাখিল করতে হবে এবং সেখানে অন্য কোনো বন্ড প্রতিষ্ঠান ছিল কি না, তা ভাড়া প্রদানকারী বন্ড অফিসকে নিশ্চিত করতে হবে। নির্ধারিত ওয়্যারহাউজ আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। কোনো পরিষেবা কিংবা বিদ্যুতের তার সেখানে থাকতে পারবে না। যথাযথ নিরাপত্তা বেষ্টনি থাকতে হবে। এছাড়া আইন ও বিধি-বিধান মানার ক্ষেত্রে ৩০০ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারসমেত হলফনামা থাকতে হবে।

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার মো. শওকাত হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, আগে যে কেউ চাইলেই বন্ড লাইসেন্স নিতে পারত। নতুন এ ব্যবস্থায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ হওয়ায় বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের সুযোগ কমে আসবে বলে আশা করছি। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে একজন প্রচ্ছন্ন রফতানিকারক বলেন, এখানে কিছু শর্তের কারণে কেবল জটিলতা, সময়ক্ষেপণ ও হয়রানির সুযোগ তৈরি হবে। বিকেমএইএর সিনিয়র সহসভাপতি  মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকার ব্যবসা সহজ করতে চায়। কিন্তু এসব শর্তের কারণে ব্যবসা ও বিনিয়োগ নিরুত্সাহিত হবে। বিশেষত স্থানীয়ভাবে পুরোনো যন্ত্রপাতি কেনা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে সনদ নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। এতে নতুন উদ্যোক্তা ব্যবসায়ে আসতে পারবে না।

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬ হাজার ৯৭৮টি। এর মধ্যে সক্রিয় রয়েছে ৩ হাজার ৮১৯টি। বাদবাকি ৩ হাজার ১৫৯টি নিষ্ক্রিয়।