বাংলাদেশে সাংবাত্সরিক যে বন্যা দেখা দেয়, তাহা অনেক ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সহিত আমরা বলিতে গেলে অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমাদের সাফল্য তাই বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। দেখা যায়, আমাদের দেশে বন্যা যত বাড়ে, তাহার সহিত পাল্লা দিয়া বাড়ে নদীভাঙন। ইহা মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করিয়া তোলে। অনেকে বাস্তুচ্যুত হয়। কেহবা আবার উদ্বাস্তু হইয়া বিভিন্ন শহর-নগরে আশ্রয় নেয়। সুতরাং যেই সকল এলাকা বন্যা ও ভাঙনপ্রবণ, সেইখানে স্থায়ী ও পাকা ঘরবাড়ি, স্কুলকলেজ, সরকারি-বেসরকারি অফিস নির্মাণ বুদ্ধিমানের পরিচায়ক নহে। তথাপি একান্ত নির্মাণ করিতে হইলে সর্বাগ্রে দরকার সয়েল টেস্ট। সয়েল টেস্ট করিয়া ও মজবুত ফাউন্ডেশন বা ভিত্তি স্থাপন করিয়া নদনদীর ধারে কেন, খোদ নদীগর্ভেও ভবন তৈরি করা যাইতে পারে; কিন্তু আমাদের দেশে এমন স্থাপনা নির্মাণের সময় সয়েল টেস্ট বা মাটি পরীক্ষাকে গুরুত্বই দেওয়া হয় না। ফলে বন্যার সময় নদীভাঙন দেখা দেওয়ামাত্র অনেক মূল্যবান স্থাপনা শেষ পর্যন্ত নদীগর্ভে তলাইয়া যায়।
গত শুক্রবার ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি ছবি ছাপা হইয়াছে। এই ছবিই অনেক কথা বলিতেছে। টাইটানিক ডুবিয়া যাইবার মতো দ্বিতল স্কুলটি বিকট শব্দ করিয়া ধীরে ধীরে নদীগর্ভে বিলীন হইয়া গেল। একটি ডুবন্ত স্কুলের এই ছবি ফেসবুকেও ভাইরাল হইয়াছে। এই স্কুল ছিল শিবচর উপজেলার চরাঞ্চলের বাতিঘর। একই দিনে এইভাবে নদীগর্ভে বিলীন হইয়াছে উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা ২ কোটি ২৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর ওমর আলী উচ্চবিদ্যালয় ও সাইক্লোন শেল্টার। শুধু এই দুই স্থাপনাই নহে, ভাঙনের শিকার হইতেছে দেশের অন্যান্য স্থাপনাও। এখন প্রশ্ন হইল, ইহার কি কোনো সমাধান নাই? সমাধান আছে; কিন্তু আমরা এই সমস্যার গভীরে যাইতেছি না। প্রথমত, আমাদের পরিকল্পনা করিতে হইবে সারাদেশে কৃষিজমি রক্ষা করিয়া কোথায় কোথায় রাস্তাঘাট, স্কুলকলেজ, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করা যায়। এই ধরনের দীর্ঘ, মাঝারি বা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকায় যে যাহার মতো যে কোনো স্থানে বসতবাড়ি গড়িয়া তুলিতেছে। আর একবার যখন বসতবাড়ি গড়িয়া উঠিতেছে, তখন সরকার সেইখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করিতে স্কুলকলেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়িয়া তুলিতে বাধ্য হইতেছে। সবকিছু পরিকল্পনা মাফিক থাকিলে ইহা সম্ভব হইত না। দ্বিতীয়ত, চরাঞ্চল বা নিচু এলাকা জানিবার পরেও কোনো স্থাপনা নির্মাণে কেন সয়েল টেস্ট করিয়া পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করা হইতেছে না? সরকারি গুরুত্বপূর্ণ অফিস যেমন থানা, ইউএনও অফিস, মিলনায়তন, মসজিদ ইত্যাদি নির্মাণেও অনেক সময় বিষয়টি খেয়াল করা হয় না।
নদীপাড়ের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা ঐতিহ্যবাহী শহর রক্ষা করিতে হইলে উন্নত মানের বাঁধ বা প্রাচীর নির্মাণের ব্যবস্থা করিতে হইবে। যে কোনো স্থাপনা তৈরি করিতে হইবে মজবুতভাবে ও দুর্নীতিমুক্ত উপায়ে। অথবা এই সকল এলাকায় স্থায়ী জনবসতি গড়িয়া তুলিবার বিষয়টিই নিরুত্সাহিত করিতে হইবে।
