প্রয়োজনকে বলা হয় উপায়ের জননী। প্রয়োজনের তাগিদেই সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বহু ক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হইতেছে। ইহা ছাড়া এই করোনাকালে আর উপায় কী? এই মহামারির সময় দেশের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ রহিয়াছে। তবে প্রতিটি সেক্টরেই সীমিত পরিসরে অনলাইন বা ভার্চুয়াল ব্যবস্থা চালু হইয়াছে। বলা যায়, সরকারের সদিচ্ছায় দেশে ডিজিটাল বিপ্লব ঘটিয়া চলিতেছে। করোনার সমস্যাটি যেহেতু স্বাস্থ্যগত সেই কারণে এই খাতেও ডিজিটাল ব্যবস্থার সুফল সমগ্র দেশের চিকিত্সাব্যবস্থার চিত্র বদলাইয়া দিতে পারে। এই ক্ষেত্রে টেলিমেডিসিনের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, অনেক অসুখ আছে যাহা ভোগায় বটে; কিন্তু ঘরে বসিয়াই চিকিত্সকের যথাযথ পরামর্শ ও প্রেসক্রিপশন ঔষধে আরোগ্য লাভ করা সম্ভব।
এই সময়ে রোগীদের মধ্যে এক ধরনের হাসপাতালভীতি কাজ করিতেছে। যেহেতু করোনা সামলাইতে চিকিত্সাব্যবস্থা শশব্যস্ত এবং শারীরিক সংস্পর্শে থেকে চিকিত্সাসেবা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণও হইয়া গিয়াছে, সেই কারণে হাসপাতাল ও ডাক্তারের চেম্বারে সরাসরি রোগী দেখিবার সুযোগও বহুলাংশে কমিয়া গিয়াছে। এই কারণেও টেলিমেডিসিনের বিকল্প নাই। কিছু অসুখ আছে যাহার জন্য অপারেশন পরেও করা যাইতে পারে; আপাতত ডাক্তারের পরামর্শমতো চলিয়া উপকৃত হওয়া সম্ভব। গর্ভবতী নারীদেরও নিয়মিত চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ প্রয়োজন। এই ধরনের ক্ষেত্রে টেলিমেডিসিন অভাবিত উপকার সাধন করিতে পারে। আমরা দেখিতেছি, এই ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগাইয়া প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের রোগীরাও এখন এই সেবা গ্রহণ করিতে পারিতেছেন। ইহাতে ঢাকার বাহির হইতে যাহাদের চিকিত্সা করাইতে রাজধানীতে আসিতে হইত, তাহাদের দুর্ভোগ কমিয়াছে। বর্তমানে টেলিফোন, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ফেসবুক ছাড়াও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমেও টেলিমেডিসিন সেবা চালু হইয়াছে। সরকারি ওয়েবসাইট করোনা ইনফোতে টেলিমেডিসিন লওয়ার একাধিক নম্বর দেওয়া আছে। ইহা ছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ৪৮২টি হাসপাতাল হইতে করোনার টেলিমেডিসিন সেবা দেওয়া হইতেছে। কমিউনিটি ক্লিনিকেও এই সেবা চালুর প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছে। ইহার বাহিরে বর্তমানে চিকিত্সকদের নানা সংগঠন, ক্লাব, বেসরকারি হাসপাতাল এবং চিকিত্সকরা ব্যক্তিগতভাবে করোনা রোগীদের টেলিমেডিসিন সেবা দিয়া যাইতেছেন। ইহার ফলে হাসপাতালের উপরও চাপ কমিয়াছে। ফলে, চিকিত্সকেরা আরো জটিল রোগীর জন্য কাজ করিবার সুযোগ পাইবেন, আবার রোগীরাও হাসপাতালে যাইয়া নিজের ও অপরের করোনায় আক্রান্ত হইবার ঝুঁকি বাড়াইবেন না। টেলিমেডিসিন যেই সকল ক্ষেত্রে কার্যকর নহে, কেবল সেই সকল রোগীই হাসপাতালে আসিতে পারেন।
আমাদের সৌভাগ্য যে, করোনা এমন এক সময় এই পৃথিবীতে দেখা দিয়াছে যখন ডিজিটাল প্রযুক্তির একরকম বিপ্লব ঘটিয়াছে। করোনার সমস্যা দুই দশক, এমনকি এক দশক আগেও পৃথিবীতে দেখা দিলে এখনকার মতো এত দ্রুতগতির প্রযুক্তিগত সুবিধা পাওয়া যাইত না। সুতরাং এই উচ্চগতির প্রযুক্তিকে কাজে লাগাইতেই হইবে। টেলিমেডিসিনের ব্যবস্থা আরো প্রযুক্তিবান্ধব ও সহজসাধ্য করিতে হইবে। ইহার মাধ্যমে আমাদের দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চিকিত্সাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব।
