বাগেরহাটের ফকিরহাটে মহিষ প্রজনন উন্নয়ন খামার, খুলনা-মোংলা রেললাইন স্থাপন এবং রামপালে খান জাহান আলী বিমানবন্দর প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্ধারিত ছকে প্রস্তুতকৃত এবং জেলা প্রশাসক কর্তৃক অনুমোদিত যৌথ তালিকা বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ওয়েবসাইট, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, স্থানীয় ভূমি অফিসের নোটিশ বোর্ডে এবং প্রকল্পের বা নিকটবর্তী সুবিধাজনক স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট সবার অবগতির জন্য গণবিজ্ঞপ্তি আকারে প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা করা হয়নি।
আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এসব প্রকল্প এলাকায় কতিপয় সার্ভেয়ারসহ একাধিক চক্রের যোগসাজশে সরকারের কোটি কোটি টাকা নানা কৌশলে কাগজ-কলমে সম্পদ বানিয়ে আত্মসাত্ হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এ প্রকল্পে সার্ভেয়ার চক্রের যোগসাজশে ফকিরহাটের জাড়িয়া মাইট কুমড়া মৌজায় এসএ ১১৮১ দাগে অধিগ্রহণ এলাকার বাইরে থাকা ঘর দেখিয়ে ১৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ উত্তোলন হয়েছে আজিজুল হক ও তার ভাবি নাছরিন বেগমের নামে। রেললাইন স্থাপন প্রকল্পে অধিগ্রহণ হওয়া সব ঘর কর্তৃপক্ষ ভেঙে দিলেও নাছরিন বেগমের ঘরটি না ভাঙার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ঘরটি ঠিকাদারের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকায় কিনে রেখেছি।’
১০৯৫ দাগে অসিম ঘোষের ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। যৌথ ফিল্ডবহি অনুযায়ী সেখানে ১৪টি ঘরবাড়ি অবকাঠামোর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ হিসাব করে ক্ষতির বর্ণনায় জমির পরিমাণ এসেছে ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। এছাড়া ঐ জমিতেই ১২৫টি গাছপালা দেখানো হয়েছে, যার জন্য আরো প্রায় ২ শতাংশ জমি প্রয়োজন।
অসীম ঘোষ বলেন, ‘আমার যা ছিল তার বাইরে যদি লেখা হয় তার দায় তো আমার না।’ তবে দায় কার জানতে চাইলে তিনি উত্তরে বলেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের।
সরেজমিন অনুসন্ধানে গেলে স্থানীয়রা বলেন, সার্ভেয়ারদের একটি চক্র ও তাদের দালালদের কারসাজিতে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে খুলনা-মোংলা রেললাইন স্থাপন প্রকল্প ও খান জাহান আলী বিমানবন্দরের জমি অধিগ্রহণ এলাকায়।
এছাড়া যেসব স্থানে ঘরবড়ি, গাছপালা বা অবকাঠামো ছিল না, সেখানেও কাগজ-কলমে বানিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে স্থানীয়রা একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করেছেন। কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি কেউ। এমন দৃশ্যমান অনিয়ম-দুর্নীতির অসংখ্য নিদর্শন থাকলেও কর্তৃপক্ষ বলেন, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তথ্য অধিকার আইনে এসব প্রকল্পের তথ্য পেতে আবেদন করলেও তা পাওয়া যায় না। অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত সব তথ্য জনসম্মুখে গণবিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ না করায় ভূমি অধিগ্রহণে বাড়ছে দুর্নীতি। একজনের জমিতে থাকা সম্পদ অন্যজনের নামে যৌথ ফিল্ড বহি তৈরি করে হাতিয়ে নিচ্ছে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা।
সম্প্রতি বেতাগা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় মহিষ প্রজনন উন্নয়ন খামারের জন্য বহুল আলোচিত বেতাগার অর্গানিক পল্লি নামে পরিচিত তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। তবে ঐ স্থানের কোনো তথ্য গণবিজ্ঞপ্তি আকারে সংশ্লিষ্ট এলাকায় উপস্থাপন করা হয়নি।
ফকিরহাট উপজেলার লখপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম আবুল হোসেন ও বেতাগা ইউপি চেয়ারম্যান মো. ইউনুস আলী শেখ জানান, ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত কোনো যৌথ তালিকা বা গণবিজ্ঞপ্তি ইউপি নোটিশ বোর্ডে বা প্রকল্প বাস্তবায়ন এলাকায় টানানো হয়নি।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ওয়েবসাইটে বা নোটিশ বোর্ডে যৌথ তালিকা প্রকাশের বিষয়টি আমি জানি না। দেখে বলতে হবে। অধিগ্রহণের নতুন কাজ আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করছি। প্রর্যায়ক্রমে সব বিষয় দেখা হবে।’
