তারুণ্য এক প্রত্যয়, চেতনার উত্স ও অনুপ্রেরণার অজেয় শক্তি। তারুণ্যের কবি সুকান্তের ভাষায়—‘জ্বলে পুড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’। তাহারাই নিজ প্রতিভায়, উদ্যমে ও কর্মযজ্ঞে বদলে দেন পৃথিবী। তাহারা আমাদের মর্মে মর্মে জাগান জয়ের প্রতিধ্বনী। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যাহারা অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তাহাদের ৮০ শতাংশের অধিক ছিলেন তরুণ। বর্তমানে এই দেশের জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগেরই বয়স ১৫ হইতে ৩৫ বত্সর। এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতছানি দিতেছে; কিন্তু সেই সকল তরুণের উল্লেখযোগ্য অংশ যদি হয় বেকার ও হতোদ্যম, তাহা হইলে দেশের সামিগ্রক উন্নয়ন হইবে কীভাবে? ইহার মূল একটি কারণ সম্প্রতি উদ্ঘাটিত হইয়াছে। এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে তরুণদের এখনো আমরা গুরুত্ব প্রদান করিতেছি না। ইহা মানিয়া লওয়া কঠিন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যাইতেছে, আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পে তরুণ সমাজের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৯ শতাংশ। আবার ইহার ৫৭ শতাংশ তথা অর্ধেকেরও অধিক বরাদ্দ কোনোভাবেই তরুণদের কাজে আসিতেছে না। এই পরিসংখ্যান সত্যিই হতাশাজনক। তরুণ ও যুবসমাজকে লইয়া কাজ করা ২২টি মন্ত্রণালয়ের চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) তথ্য বিশ্লেষণ করিয়া এই চিত্র পাইয়াছেন গবেষকরা। অথচ বাংলাদেশে তরুণদের কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপক সম্ভাবনা রহিয়াছে; কিন্তু শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত তরুণ বেকারত্ব সেই সম্ভাবনাকে অনেকখানি ম্লান করিতেছে। বর্তমানে করোনা মহাদুর্যোগকালে তাহারা সকলের চাইতে অধিক বিপদে রহিয়াছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক স্থবিরতায় কাঙ্ক্ষিত হারে তাহাদের কর্মসংস্থান হইতেছে না। বরং ইহার বিপরীতে অনেক তরুণ-তরুণী করোনার অভিঘাতে পড়িয়া চাকুরি হারাইয়াছেন। এই অবস্থায় তাহাদের বাঁচাইতে হইলে তরুণ ও যুবসমাজ সহায়ক বাজেটকাঠামো গড়িয়া তোলা প্রয়োজন। এডিপিতে তাহাদের জন্য প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ প্রয়োজনীয় খাতে অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা দরকার। তাহাদের জন্য দরকার বরাদ্দকৃত অর্থের সদ্ব্যবহারও।
বাংলাদেশের তরুণদের কেহ পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতের চূড়ায় উঠিয়া বাংলাদেশের পতাকা উড়াইতেছেন। কেহ কেহ ক্রিকেটে অসামান্য কৃতিত্ব দেখাইতেছেন। অনেকে পৃথিবীর খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে কাজ করিবার সুযোগ পাইয়া মেধার স্বাক্ষর রাখিতেছেন। তাই আমাদের ছেলেমেয়েদের লইয়া আমরা খুবই আশাবাদী। তাহাদের যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়া একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে। তাহাদের হস্তে কাজ দিতে হইবে বা আত্মকর্মসংস্থান তৈরির সকল উদ্যোগকে উত্সাহিত করিতে হইবে। আগামী অর্ধদশকের মধ্যেই তাহারাই রাষ্ট্রের ও সমাজের সকল ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিবেন। তাই তাহাদের নিকট দেশ ও জাতির যেমন অনেক প্রত্যাশা, তেমনি তাহাদের চাওয়া-পাওয়াগুলিও আমাদের পূরণ করিতে হইবে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখিয়াছেন, ‘চড়িয়া সিংহে ধরে কেশর— নৌজোয়ান!/ বাহন তাহার তুফান ঝড়—নৌজোয়ান’। এই অপ্রতিরোধ্য শক্তিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগাইবার সকল আয়োজন করিতে হইবে। অন্যদিকে কবি হেলাল হাফিজ লিখিয়াছেন, ‘যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময়’। আমরা মনে করি, স্বাধীনতা অর্জনের পর আমাদের এখন এই মূলমন্ত্র হওয়া উচিত—যৌবন যাহার, অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখিবার তাহার শ্রেষ্ঠ সময়। প্রবীণের প্রজ্ঞা ও পরামর্শ এবং নবীনের এই বল-বীর্য, সাহস ও উদ্দীপনার মাধ্যমে আমরা একটি উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। এই স্বপ্ন বৃথা যাইবে না নিশ্চয়ই।
