গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের কালাসোনা গ্রামের দিনমজুর কাশেম মিয়া (৪৫) বললেন, ‘বান আসি হামরা হাবুডুবু খাবার নাগচি। কসটো করি পানির মদ্দে আচি। তাও বানের মদ্দে কোনো ইলিপ পানো না।’ পাশের কাবিলপুর গ্রামের করিমন নেছা (৫৫) বলেন, ‘হামার ঘরে এ্যাকনা ঘর, তাক ১১ দিন আগোত ডুবি গেচে। তকন থাকি বানদোত আচি। মানসের বাড়িত কাম করি সোংসার চলাছি। একন বানের সমায় কাউয়ো কামোত ন্যায় না। এবাড়িত ওবাড়িত থাকি চায়া খাব্যার নাগচি। কয়দিন চেরমেনের কাচে গেচিনো, ইলিপ পাই নাই।’কাশেম আর করিমন নেছার মতো বন্যাদুর্গত বিভিন্ন জেলার অসংখ্য বানভাসি মানুষ বড় কষ্টে আছেন। পাচ্ছেন না ত্রাণ। বন্যার পানিতে ডুবে আছে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট। এমন পরিস্থিতিতে বাঁধে আশ্রয় নিয়ে গবাদি পশুসহ খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের কোথাও বন্যার পানি কমলেও অনেক জায়গায় বেড়েছে। ফলে সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতির তেমন একটা উন্নতি হয় নাই। পানি কমার কারণে অনেক স্থানে তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন। ঘরবাড়ি নদীতে হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে লোকজন।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ঘাঘট, করতোয়া ও তিস্তা নদীর পানি সামান্য কমেছে। তবে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি স্থির রয়েছে। সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলার সাতটি উপজেলার ৩১টি ইউনিয়নের শতাধিক প্লাবিত গ্রামের দেড় লক্ষাধিক পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। এর মধ্যে অনেক বন্যার্ত এখনো প্রয়োজনীয় ত্রাণ বা সহায়তা পাননি। বিশেষত দুর্গম চরাঞ্চলগুলোতে ত্রাণ যাচ্ছে না।
জেলার সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, সাদুল্লাপুর ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার ১৯টি পয়েন্টে ব্যাপক নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গাইবান্ধা শহর রক্ষাবাঁধসহ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৫২টি পয়েন্ট এখন চরম হুমকির মুখে রয়েছে।
ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহতাব উদ্দিন বলেন, ইউনিয়নের ১৬ হাজার মানুষের মধ্যে ১০ হাজার মানুষ গত ১৫ দিন থেকে পানিবন্দি হয়ে আছে। তাদের মধ্যে মাত্র ৪ হাজার জনকে ১০ কেজি করে চাল প্রদান করেছি। এখন হাতে কোনো ত্রাণ নেই। তাই দিতে পারছি না।
স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর জানান, জেলার গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ, কাউনিয়া এবং পীরগাছা উপজেলায় তিস্তা এবং ঘাঘটের উপচেপড়া বন্যার পানি এরই মধ্যে বিভিন্ন সড়ক এবং সেতু ও কালভার্ট ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। পানি কমে যাওয়ায় নতুন করে বসতভিটা এবং গাছপালাসহ ফসলি জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভাঙনের শিকার মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে এরই মধ্যে গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের তিস্তা প্রতিরক্ষা বাঁধের ১৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একই ইউনিয়নের পাইকান আকবরিয়া ইউসুফিয়া ডিগ্রি মাদ্রাসার কাছে ৬০ মিটার অংশ তিস্তায় বিলীন হয়েছে। লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পানির তোড়ে গঙ্গাচড়া উপজেলার দুই ইউনিয়নের বহু ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানিয়েছেন, নদীভাঙন রোধে তিস্তাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধমূলক কাজ করা হচ্ছে।
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, দুই দিন ধরে আবারও যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। উপজেলার ১৫০টি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। শত শত তাঁত ডুবে গেছে। তাঁতমালিক ও তাঁতশ্রমিকরা বেকার হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) সংবাদদাতা জানান, সালদা ও বুড়ি নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তলিয়ে গেছে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের ফসল, বীজতলা ও সবজিবাগান। ভেসে গেছে কয়েক শ পুকুর ও খামারের মাছ। বিপাকে পড়েছেন ঐ সব এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মাছচাষিরা।
কৃষি অফিসের তথ্যমতে উপজেলায় পানির নিচে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে ১০ হেক্টর জমির ফসল এবং বীজতলা নষ্ট হয়েছে প্রায় ১৫ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন কৃষক জানান, অতিরিক্ত বীজ কোনো কৃষকের ঘরেই থাকে না। বীজ সংকট দেখা দিলে ধান রোপণ করা সম্ভব হবে না। সরকার যদি কৃষি অফিসের মাধ্যমে বিনা মূল্যে বীজের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে কৃষকরা উপকৃত হবেন।
