যুক্তরাষ্ট্রসহ আট দেশের আপত্তির মুখে জাতিসংঘের অভিবাসন চুক্তি সই

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:৩৮

ইউরোপ জুড়ে এই

বিতর্ক চলতে থাকবে। কারণ তারাই এর ভুক্তভোগী। তবে ইউরোপে সরকার বিরোধী শক্তিগুলো এই বিতর্কে যতদূর পারে টেনে নিয়ে যাবে। অন্ততপক্ষে ২০১৯ সালের ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত বিতর্ক থামবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে

বরকতুল্লাহ সুজন

সারাবিশ্বের অভিবাসন সংকট মোকাবেলায় গত মাসে মরক্কোর কারাকাসে ঐতিহাসিক এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো। যা আগেই বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সরকারের বলিষ্ঠতায় জার্মানি, ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় দেশগুলোর অনেকেই চুক্তিতে সই করলেও এ নিয়ে দেশের ভেতরে তারা রয়েছেন কঠিন চাপের মুখে। ইউরোপে এই ইস্যুতে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। কারণ লাখ লাখ উদ্বাস্তুকে সামলাতে হচ্ছে এসব দেশগুলোকেই। কোন কোন দেশ শরণার্থী সংকট নিয়ে স্পষ্টই দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ, সহিংসতা হয় বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে। পরে পদত্যাগে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী শালো মিশেল। তবে সমর্থকরা বলছেন, চুক্তির ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়বে এবং শরণার্থী ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটবে। আর বিরোধীদের আশঙ্কা, অবৈধ অভিবাসীদের উত্সাহ যোগাবে এই চুক্তি।

আরব বসন্ত পরবর্তী লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেন যুদ্ধ এবং আইএস জঙ্গির উত্থানে ক্ষতবিক্ষত হয় গোটা মধ্যপ্রাচ্য। জীবনের ঝুঁকি নিতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আশ্রয় খুঁজতে মরিয়া হয় লাখ লাখ শরণার্থী। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগরে তলিয়ে প্রাণ যায় বহু উদ্বাস্তুর। চলতি বছরও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে মারা যায় দুই হাজারেরও বেশি শরণার্থী। এরপরও থামেনি ওই মরণপথের যাত্রা। শরণার্থীদের পদভারে ভারী হতে থাকে ইউরোপের মাটি। একদিকে মরণপণকারী অভিবাসীদের তাত্ক্ষণিক আশ্রয় দেয়ার মানবিক চাহিদা। অন্যদিকে দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতার বাস্তবতায় বড় ধরনের টানাপোড়েনে পড়ে ইউরোপ। এ অবস্থায় শরণার্থীদের নিরাপদ, বিধিসম্মত ও নিয়মিত অভিবাসনে একটি বৈশ্বিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে জাতিসংঘ।

২০১৬ সালে অভিবাসন ইস্যুতে সম্ভাব্য বৈশ্বিক চুক্তি নিয়ে প্রাথমিকভাবে আলোচনা শুরু হয়। বহু আলোচনা, বিতর্ক, বিশ্লেষণের পর চুক্তির খসড়াও তৈরি হয়। গত জুলাইয়ে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে চুক্তির খসড়া উত্থাপন করা হলে সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ১৯৩ সদস্য দেশের সবাই একমত হয়। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হয় গত ১০ ডিসেম্বর মরক্কোর মারাকাশে। কিন্তু সেখানে কেবল ১৬৪ দেশ চুক্তিতে সই করে। চুক্তি প্রত্যাখ্যানকারী যুক্তরাষ্ট্রের কাতারে যুক্ত হয় হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, ইতালি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, চিলি ও অস্ট্রেলিয়া।

জাতিসংঘের অভিবাসন চুক্তিতে কোন আইনী বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। প্রতিটি দেশের নিজস্ব অভিবাসন নীতি থাকার ব্যাপারেও অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও বিরোধিতা কেন? মূল বিষয়টা হলো- এই চুক্তিতে সই করার মানে হলো আন্তর্জাতিক অভিবাসন ইস্যুতে একে অপরকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া; অভিবাসীদের জন্য কার্যকর কিছু করার দায়বদ্ধতা তৈরি হওয়া। গত জুলাইয়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে অভিবাসন ইস্যুতে চুক্তির খসড়া পাশ হলে এর পক্ষে নিজ নিজ সরকারের অবস্থান নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শুরু হয় তুমুল সমালোচনা ও বিক্ষোভ। মরক্কোর মারাকেশে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল বলেন, অবৈধ অভিবাসন কয়েকটি দেশে ভয় ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে, যাকে ভালোমতই ব্যবহার করছে চুক্তি বিরোধী শক্তিগুলো। এর ফলে দ্রুত ছড়াচ্ছে ভুল তথ্য। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুটারেসও জানান, চুক্তিকে ঘিরে ইউরোপবাসীর মধ্যে অন্ধ বিশ্বাস কাজ করছে।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে প্রথম দেশ হিসেবে চুক্তির আয়োজন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর থেকে এ বিষয়ে কোন আলোচনাতেও অংশ নেয়নি ওয়াশিংটন। এক বিবৃতিতে দেশটি জানায়, জাতিসংঘ যে চুক্তি করতে যাচ্ছে, তা মার্কিন সার্বভৌমত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া মার্কিন অভিবাসন নীতি সবসময় ও কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাই নির্ধারণ করবেন, অন্য কেউ নন। এরপর গত জুলাইয়ে নিজেদের বিরোধিতার কথা জানায় হাঙ্গেরি। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, চুক্তিটি বিশ্বের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। কারণ এর ফলে অনুপ্রাণিত হবে লাখ লাখ অভিবাসী। এভাবে ক্রমেই বাড়তে থাকে অভিবাসন চুক্তির বিরোধিতা, বিতর্ক। জার্মান সরকার এই চুক্তির শক্ত সমর্থক হলেও কঠিন বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। বিরোধী শক্তিগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ করার কাজে নেমেছেন চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল।

চুক্তিতে মূলতঃ ২৩টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- আন্তর্জাতিক অভিবাসন সম্পর্কে নিজেদের তথ্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করা; যেসব কারণে মানুষ নিজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, সেসব ইস্যুতে কাজ করা; অভিবাসীদের প্রমাণ্য ও আইনগত বৈধ পরিচয়পত্র দেয়া; চোরাচালান ও মানবপাচারের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখা ইত্যাদি। চুক্তিতে যে বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তা হলো- সব শরণার্থী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে স্বীকৃতি দেয়া এবং ব্যক্তি ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ ও বিদেশি ফোবিয়াসহ সব ধরনের বৈষম্য বন্ধ করা। চুক্তিতে এও বলা হয়েছে যে, জাতীয় অভিবাসন নীতি নির্ধারণে দেশগুলো সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। এমনকি ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, জাতিসংঘ চুক্তিতে সই করলেও ইইউভুক্ত দেশগুলোর প্রচলিত আইনে কোন পরিবর্তন আনার প্রয়োজন পড়বে না। বিশে­ষকরা বলছেন, ইউরোপ জুড়ে এই বিতর্ক চলতে থাকবে। কারণ তারাই এর ভুক্তভোগী। তবে ইউরোপে সরকার বিরোধী শক্তিগুলো এই বিতর্কে যতদূর পারে টেনে নিয়ে যাবে। অন্ততপক্ষে ২০১৯ সালের ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত বিতর্ক থামবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।