প্রতি বত্সর ঈদের ছুটিতে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলিতে দুর্ঘটনা এবং ইহাতে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এই সময় রাস্তায় যানবাহন ও যাত্রীদের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং অদক্ষ চালক ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের সংখ্যা বাড়িবার কারণে দুর্ঘটনার হারও বাড়িয়া যায়; কিন্তু করোনাকালে ঈদ উদ্যাপনের জন্য নাড়ির টানে ঘরমুখী মানুষ এবং একই কারণে যানবাহনের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম থাকিলেও এইবার ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়া গিয়াছে—এমনটি বলিবার অবকাশ নাই। এই বত্সর ঈদুল ফিতরের সময় ১৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। ইহাতে প্রাণহানি হয় ১৬৮ জনের। আহত হন ২৮৩ জন। আর ঈদুল আজহায় এখনো সামগ্রিক চিত্র পাওয়া না গেলেও গত কয়েক দিন ধরিয়া যে হারে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর আসিতেছে, তাহাতে উদ্বিগ্ন হওয়া ছাড়া উপায় নাই। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রতিনিয়ত শোকের কাহিনি তৈরি হইতেছে এই দেশে।
বলা হইতেছে, সড়ক-মহাসড়ক যখন ফাঁকা থাকে, তখনই বেশি দুর্ঘটনা ঘটিবার আশঙ্কাও থাকে। কেননা অনেক চালক রাস্তা ফাঁকা পাইয়া যানবাহনের গতি বাড়াইয়া দেন। এই অনিয়ন্ত্রিত ও বেপরোয়া গতিই সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ (৯০ শতাংশ)। প্রশ্ন হইল—এই দেশের মানুষকে আর কতদিন এমন বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হইতে হইবে? নিরাপদ সড়কের দাবিতে এত আন্দোলন, এত সুপারিশ-পরামর্শ ও নূতন প্রবর্তিত আইন—সকলই কি বৃথা যাইবে? এই সকল কিছু কি পর্যবসিত হইবে অরণ্যে রোদনে? দুর্ঘটনার হার কমাইয়া আনিবার জন্য দক্ষ চালক তৈরিতে আর কতদিন লাগিবে? এমন চালক রহিয়াছেন যাহাদের তেমন কোনো প্রশিক্ষণই নাই। এমনকি তাহারা রাস্তার সাইন-সিম্বল সম্পর্কে অজ্ঞ ও অসচেতন। মালিকরা কীভাবে তাহাদের নিয়োগ দেন ইহাই বড় প্রশ্ন। রোড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা আমরা বহুদিন ধরিয়া বলিয়া আসিতেছি। এই জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং কোথায় কোথায় রাস্তাঘাট হইবে তাহা সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। ইহাতে কেহ সেই সকল স্থানে ঘরবাড়ি বা বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করিবেন না এবং সড়ক আঁকাবাঁকা হইবে না বিধায় দুর্ঘটনাও কমিয়া আসিবে।
মোদ্দা কথা, সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করিতে হইলে পরিবহন খাতের বিরাজমান বিশৃঙ্খলা দূর করিয়া ইহার ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। শিক্ষাদীক্ষা ও প্রশিক্ষণে শ্রমিকদের হইতে হইবে উন্নত মানের এবং তাহাদের চাকুরির গুণমানের উন্নতি সাধন করিতে হইবে। আইন মানিয়া চলিবার ক্ষেত্রে পথচারীদের হইতে হইবে সজাগ ও সচেতন। ইদানীং মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, ট্রাক, পিকআপ, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস অধিক হারে দুর্ঘটনা ঘটাইতেছে। এই ব্যাপারেও আমাদের ভাবিতে হইবে। ২০১৮ সালের চাইতে গত বত্সর সড়কে প্রাণহানির হার বাড়িয়াছে ১৮ শতাংশ। আবার গত বত্সর ঈদুল আজহায় ১৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮৫ জন নিহত ও ৩৫৫ জন আহত হইয়াছিলেন। সুতরাং এই দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণগুলি যথাযথভাবে চিহ্নিত করিয়া সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই আমাদের কাম্য।
