কোরবানির চামড়া নিয়ে গত বছরের বাজে পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেয়নি দায়িত্বশীল পক্ষগুলো। ফলে এবার চামড়ার দামে নজিরবিহীন খারাপ পরিস্থিতি দেখতে হলো। মাঠ পর্যায়ে চামড়া কেনার লোকই পাওয়া যায়নি। চামড়া পঁচে গিয়ে দুর্গন্ধ ঠেকাতে কোথাও কোথাও নিজ খরচায় মাদ্রাসা কিংবা এতিমখানায় চামড়া পৌঁছে দিয়ে আসতে হয়েছে। আবার চামড়া কেনার লোক (মৌসুমী ব্যবসায়ী) না পাওয়ায় পরিবহনে করে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে চমড়া বিক্রি করতে গিয়ে মাদ্রাসা বা এতিমখানার মত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বলতে গেলে ‘ফ্রি’ দিয়ে এসেছে। যে টাকা পাওয়া গেছে, তাতে কারো কারো পরিবহন খরচও উঠেনি। এ ধরণের চিত্র বেশি দেখা গেছে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে। এসব জায়গায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতি পিস চামড়া বিক্রি হয়েছে গড়ে একশ টাকায়। কোথাও কোথাও তাও মেলেনি। একটি ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ১০ টাকায়! অথচ দুই দশক আগেও একটি মাঝারি আকারের চামড়া বিক্রি হয়েছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গতবারের মত বিপুল সংখ্যক চামড়া ফেলে দেওয়া কিংবা পুঁতে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গতবারের বাজে অবস্থা থেকে শিক্ষা নিয়ে সময়মত ও যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় এবার আরো খারাপ পরিস্থিতি দেখতে হলো।
এদিকে চট্টগ্রামসহ বেশকিছু এলাকায় পানির দরে চামড়া কিনে ভালো মুনাফার আশায় মজুদ করে রেখেছেন ফড়িয়ারা। ফলে চামড়ার প্রকৃত সুবিধাভোগীরা (গরীব, অসহায় মানুষ) বঞ্চিত হলেও পকেট ভারী হবে একশ্রেণির ব্যবসায়ীদের।
ঢাকার মিরপুরের আব্দুর রহমান নামে এক কোরবানিদাতা ইত্তেফাককে বলেন, ঈদের দিন তার গরুর চামড়া কিনতে কেউ আসেনি। পরবর্তীতে স্থানীয় এক মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে নিজ খরচে তা পৌঁছে দেন। তার এলাকার অন্যরাও একইভাবে নিজ থেকে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি জানান, মিরপুরের পাশ্ববর্তী আমিনবাজার কিংবা কাউন্দিয়া এলাকার অনেকে চামড়া গর্তে পুঁতে ফেলা কিংবা পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছেন বলে জেনেছেন তিনি।
জানা গেছে, কেবল চট্টগ্রামেই দর না পেয়ে ১৫ হাজার চামড়া ফেলে রাখায় তা নষ্ট হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এসব চামড়া অপসারন করেছে।
লক্ষীপুর জেলা সদরের একটি মাদ্রাসার পরিচালক রুহুল আমিন জানান, কোন ক্রেতা না আসায় তাদের সংগ্রহকৃত চামড়া একশ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। তাতে পরিবহন ব্যয়ও উঠেনি।
ঈদের আগে বানিজ্য মন্ত্রণালয় গতবারের চেয়ে প্রতি বর্গফুট গড়ে ১০ টাকা কমিয়ে এবার চামড়ার দাম নির্ধারণ করে গরু ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। সেই হিসেবে মাঝারি মানের একটি গরুর চামড়া (২২ বর্গফুট) চামড়া ট্যানারি মালিকরা লবণ দেওয়াসহ কিনবেন ৭৭০ থেকে ৮৮০ টাকায়।
এমন অবস্থার জন্য দায় নিচ্ছে না ব্যবসায়ীদের কোন পক্ষই। আগামী শনিবার থেকে চামড়া কিনতে শুরু করবেন ট্যানারি মালিকরা। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, শনিবার থেকে সরকার নির্ধারিত দামেই আমরা চামড়া কিনব। ঈদের সময় চামড়া নিয়ে ‘যা হয়েছে’ তাতে আমাদের হাত ছিলো না।
লবণজাত চামড়া কেনাবেচার মূল জায়গা পুরনো ঢাকার পোস্তা। সেখানে মূলত ফড়িয়া, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা আড়তদারদের কাছে গিয়ে চামড়া বিক্রি করে থাকেন। সেখান থেকেই সরকার নির্ধারিত দামে ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করা হয়। আড়তদারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, লবণ দেওয়া, পরিবহন, কারিগরের মজুরি মিলিয়ে প্রতি বর্গফুট চামড়ায় ৬ থেকে ৮ টাকা করে খরচ হয়। ওই খরচ বাদ দিয়ে ২৫ বর্গফুটের একটি চামড়ার দাম গড়ে ৩০ টাকা হিসেবে মাঠ পর্যায়ে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু এই দামের ধারে কাছেও পান নি কেউ। তহলে প্রশ্ন উঠেছে, এই মুনাফা কাদের পকেটে যাচ্ছে বা গেছে?
আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড এন্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আফতাব ইত্তেফাককে জানান, দুই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া তাদের নিয়মিত ব্যবসায়ীরা সঠিক দামেই কিনেছেন। অন্যদিকে বেপারি বা ফড়িয়ারা বলছেন, পোস্তায় গিয়েও সঠিক দাম পাচ্ছেন না।
ঈদের দিন কয়েক আগে দাম নির্ধারণ করে বানিজ্য মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। শেষ সময়ে এসে এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সমালোচনা করছেন অর্থনীতিবিদরা। পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, চামড়ার যে এ পরিস্থিতি হবে, তা আগেই অনুমিত ছিলো। রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার দরকার ছিলো বহু আগে। অথচ ঈদের দুই একদিন আগে রপ্তানির কথা বলা হলো।
আমাদের চট্টগ্রাম অফিস জানিয়েছে, চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চামড়ার অস্বাভাবিক দরপতন ঘটেছে। চট্টগ্রাম মহনগর ও জেলায় এবার প্রায় ৭ লাখ ১৬ হাজার পশু কোরবানি হয়েছে। কিন্তু আড়তদারদের কাছে এই পর্যন্ত চামড়া পৌঁছেছে সাড়ে ৩ লাখ। ফলে প্রচুর চামড়া এখনো জেলার বিভিন্ন স্থানে ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা মজুদ করে রেখেছেন। কোরবানির দিন চামড়া বিক্রি করতে না পারায় মৌসুমী ব্যবসায়ীদের প্রায় ১৫ হাজার পিস কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। কোরবানির দিন বিভিন্ন স্থানে পানির দামে চামড়া বিক্রি হয়েছে।
