১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি জাতীয় সংসদে বিরতিহীনভাবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। কখনো বিরোধী দলে, কখনো সরকারি দলে। সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদে যুক্তিপূর্ণ আলোচনায় তুলে ধরেছেন এলাকার মানুষের কথা, সরকারের নীতিনির্ধারণী কৌশল বা দলের ভূমিকার কথা। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই জাতীয় সংসদ ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের রাজনৈতিক জীবন।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নক্ষত্রের নাম সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। একজন পরিচ্ছন্ন, সত্ রাজনীতিবিদ, নির্ভেজাল ও নির্লোভ মানুষ ছিলেন তিনি। দৃঢ়চিত্তের অধিকারী এই নেতা ছিলেন দেশ ও দলের দুঃসময়ের কাণ্ডারি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্নেহভাজন। দলমত নির্বিশেষে ছিলেন সবার আস্থাভাজন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো অকৃত্রিম বন্ধু। বিচক্ষণতা, অবিচল আস্থা, নির্লোভ ও সত্ রাজনীতির অনন্য প্রতীক। রাজনীতির সততায় জীবন গড়েছিলেন তিনি। তার চিরবিদায়ে দেশ হারিয়েছে ক্ষণজন্মা এক রাজনীতিবিদকে। আওয়ামী লীগ হারিয়েছে দলের একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতাকে। সৈয়দ আশরাফের বিদায়ে শোকে মুহ্যমান গোটা জাতি। কেননা দলীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে অনেক আগেই তিনি মিশে গিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের মধ্যে। একজন অসাধারণ মানুষ হয়েও তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তার মতো ত্যাগী, দূরদর্শী ও সজ্জন রাজনীতিক সচরাচর দেখা যায় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন থাকার কারণে শেষদিকে অসুস্থ থাকার পরও তাকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। বিপুল ভোটে বিজয়ী করে কিশোরগঞ্জবাসী জানিয়ে দেন, সৈয়দ আশরাফ রয়েছেন তাদের মণিকোঠায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে তার শপথ নেওয়া হলো না। সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে, অনন্তলোকে।
আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। একাত্তরের রণাঙ্গনের যোদ্ধা ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পর সৈয়দ আশরাফ বৃহত্তর ময়মনসিংহ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে বাবা সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানে তিনি আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নীতি ও আদর্শের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৈয়দ আশরাফ ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে আসেন। ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ সরকারের ওই মেয়াদে বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০১ সালেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ আশরাফ। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে পুনরায় বিজয়ী হয়ে সৈয়দ আশরাফ দক্ষতার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রী হন সৈয়দ আশরাফ। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ব্রিটিশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত শীলা ইসলামকে বিয়ে করেন। শীলা লন্ডনে শিক্ষকতা পেশায় জড়িত ছিলেন। ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর তিনি মারা গেলে সৈয়দ আশরাফ অনেকটা নিভৃত জীবনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাদের একমাত্র কন্যা রীমা ইসলাম লন্ডনের এইচএসবিসি ব্যাংকে চাকরি করেন।
