জোয়ারের পানিতে বিভিন্ন স্থানে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২০, ২২:৫২

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে নোয়াখালীর হাতিয়ার মেঘনায় ট্রলারডুবির ঘটনায় নিহত দুই জেলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্নস্থানে জোয়ারের পানিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত পবিবার। ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।

 হাতিয়া (নোয়াখালী) :নদী ও সাগর উত্তাল থাকায় বুধবার সন্ধ্যায় হাতিয়া উপকূলীয় মেঘনায় দুইটি মাছ ধরা ট্রলার ডুবে যায়। এতে মাইন উদ্দিন ও আনোয়ার হোসেন নামে দুই জেলের লাশ এবং ২৪ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত মাইন উদ্দিনের বাড়ি উপজেলার জাহাজমারা ইউনিয়নের বিরবিরি                 গ্রামে এবং আনোয়ার হোসেনের বাড়ি পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের চরকৈলাশ গ্রামে। এদিকে পূর্ণিমা ও লঘুচাপের কারণে প্রবল জোয়ারে নিঝুম দ্বীপ, বয়ারচর, নলেরচর, কেরিংচর, ঢালচর, সুখচর, চর ঈশ্বর, তমরদ্দি, চর কিং, নলচিরা ও সোনাদিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার খেতের ফসল ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। অনেক কাঁচাঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। কয়েক স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ঐ সব এলাকার লোকজন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

কাউখালী (পিরোজপুর) :বৃহস্পতিবার অতি জোয়ারের পানিতে উপজেলার নদী তীরবর্তী পাঁচটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের অন্তত ২০ গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পিরোজপুর-কাউখালী-স্বরুপকাঠী সড়কের বিভিন্নস্থান পানিতে তলিয়ে গেছে। গত দুই দিন জোয়ার ও অতিবর্ষণে নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ২ থেকে ৩ ফুট ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় তলিয়ে গেছে ফসলের খেত, বসতঘর, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। নদী-তীরবর্তী আমরাজুড়ি, কুমিয়ান, পাঙ্গাশিয়া, জোলাগাতি, সুবিদপুর, সোনাকুর, আশোয়া, জব্দকাঠী, শির্ষা, কচুয়াকাঠী, বাশুরী, রঘুনাথপুর, বেকুটিয়া, ধাবরী, গর্ন্ধব, জয়কুল, বিড়ালজুড়ি, ডুমজুড়ি, আসপর্দী, কচুয়াকাঠী, গুচ্ছগ্রামসহ উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কাউখালীর বেকুটিয়া, আমরাজুড়ি ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যাত্রীরা দুর্ভোগের শিকার হয়। অব্যাহত জোয়ারের পানি এবং অবিরাম বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এ এলাকার হাজার হাজার মত্স্যচাষি।

গোপালগঞ্জ :মধুমতী বিলরুট চ্যানেলের পানি বিপত্সীমা স্পর্শ করেছে। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া  সদর উপজেলার মানিকদাহ ও জালালাবাদে মধুমতী নদীতে ভাঙন শুরু হওয়ায় স্থানীয়রা রয়েছেন আতঙ্কের মধ্যে। পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গোপালগঞ্জ সদর, কাশিয়ানী, মুকসুদপুর ও কোটালীপাড়া উপজেলার অন্তত ৩০টি গ্রামের ৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ৫০০ পরিবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ ও উঁচু সড়কে আশ্রয় নিয়েছে। এসব এলাকার ছোট-বড় ১ হাজার পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। নষ্ট হয়েছে শাকসবজি। জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা জানান, দুর্গতদের সাহায্যের জন্য ৩০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া  শিশু, গো-খাদ্য ও শুকনো খাবারের জন্য ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

চিতলমারীতে চিংড়িঘের প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা

চিতলমারী (বাগেরহাট) :চিতলমারীতে প্রবল বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে চিংড়িঘের ও সবজি খেত প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে শত শত চাষি এখন ঘের রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিস্থিতি আরো অবনতি দেখা দিলে এসব ঘের রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে হতাশা প্রকাশ করেছেন চাষিরা। স্থানীয় চাষি ও মত্স্য অফিস জানায়, গত কয়েক দিনের বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে নিম্নাঞ্চাল প্লাবিত হওয়ায় অনেক চিংড়িঘের ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ঘেরের পাড়ে নেট ও পাটা দিয়ে ঘের রক্ষা করার অপ্রাণ চেষ্টা করছে চাষিরা। পাশাপাশি এসব ঘেরের পাড়ের শশা, করলা, লাউ, কুমড়াসহ অনেক সবজি খেতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন চাষিরা।

মেঘনার অস্বাভাবিক জোয়ারে ভেসে গেছে সহস াধিক পুকুর

কমলনগর (লক্ষ্মীপুর):মেঘনা নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পূর্ণিমার প্রভাবে মেঘনা নদীর জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট বেড়ে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে দুই উপজেলার নিম্নাঞ্চলীয় এলাকার প্রায় অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে থাকাসহ জোয়ারের স্রোতে দেড় সহস্রাধিক কাঁচাঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জোয়ারে প্রায় ১০ হাজার হাঁস-মুরগি মারা যাওয়ার পাশাপাশি সহস্রাধিক পুকুর ও ঘেরের মাছ ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রাস্তাঘাট ও পুল-কালভার্ট বিধ্বস্ত হয়ে অভ্যন্তরীণ কয়েকটি সড়কে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে।

জানা গেছে, পূর্ণিমার প্রভাবে বুধবার বিকাল থেকে মেঘনার জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট বেড়ে যায়। বেড়িবাঁধ না থাকায় এতে নদীর তীরবর্তী কমলনগর উপজেলার মতিরহাট, নাছিরগঞ্জ, কাদির পণ্ডিতেরহাট, চরজগবন্ধু, মাতাব্বরহাট, লুধুয়া ফলকন ও পাটারীরহাট এবং রামগতি উপজেলার বালুরচর, সুজনগ্রাম, জনতা বাজার, মুন্সীরহাট, সেবাগ্রাম, চরআলগী, বড়খেরী, চরগাজী, চরগজারিয়া, চর মুজাম্মেল ও তেলিরচর এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। প্লাবিত হয় মতিরহাট, নাছিরগঞ্জ, কাদির পণ্ডিতেরহাট, পাটারীরহাট, লুধুয়া বাঘারহাট, মুন্সীরহাট, জনতা বাজার ও চেয়ারম্যান বাজার। এতে দোকানঘরের মালামাল নষ্ট হয়ে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জোয়ারের পানিতে বিভিন্ন এলাকার খামারিদের হাঁস-মুরগি মারা যাওয়াসহ গবাদি পশু পানিতে ভেসে যায়। জোয়ারের স্রোতে দেড় সহস্রাধিক কাঁচা বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ পানিতে ভেসে যায় পুকুর ও ঘেরের মাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কয়েক শ কিলোমিটার কাঁচা ও পাকা সড়কের।

এদিকে ঐ সব এলাকায় রান্নার চুলা পানিতে ডুবে থাকায় লোকজন চরম খাদ্যসংকটে ভুগছেন। যদিও ঐসব পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে।

কমলনগর উপজেলার চরফলকন এলাকার মত্স্য চাষি সিরাজুল ইসলাম জানান, জোয়ারের পানিতে তার তিনটি ঘেরের প্রায় ২০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে।

চরলরেন্স এলাকার তাজ লেয়ার মুরগি খামারের স্বত্বাধিকারী মো. ওসমান জানান, আকস্মিক জোয়ারের পানিতে তার খামার ডুবে প্রায় ৫ হাজার মুরগি মারা গেছে। এতে তিনি প্রায় ২৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবারক হোসেন জানান, মেঘনার ভাঙনে বেড়িবাঁধ ভেঙে নদী তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনসহ জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।