বর্তমানে আমাদের দেশের সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা। সময়ের বিবর্তনে যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের শিরোনামে আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে দেশের বিভিন্ন স্থানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার চিত্র। এইসব সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় আমরা দেখতে পাই হাজার হাজার মায়ের সন্তান হারানোর আর্তনাদ, শিক্ষার্থীদের স্বপ্নগুলো যানবাহনের চাকার নিচে পিষ্ট হওয়ার গল্প। যেকোনো দেশের অগ্রযাত্রায় সেদেশের মানব সম্পদের ভূমিকা অত্যধিক। কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনা নামক মহামারীতে প্রাণ হারাচ্ছে তাতে এ দেশের অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে কি কোনো প্রভাব পড়ছে না? মহামারী রূপে ধারণ করা এইসব সড়ক দুর্ঘটনার ফলে আমরা বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনায় আমরা আমাদের দেশের অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোকে হারিয়েছি, তার মধ্যে অন্যতম তারেক মাসুদ এবং মিশুক মুনির। এইসব সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ তাদের কর্মকাণ্ড দ্বারা বিশ্বের দরবারে শুধু নিজেদের তুলে ধরেননি এদেশকে সম্মানের এক উচ্চ মর্যাদায় নিয়ে গিয়েছেন, তাদের মত অমূল্য সম্পদগুলোকে হারিয়ে আজও আমরা সচেতন হতে পারিনি। আমাদের দেশকে সড়ক দুর্্ঘটনার কবল থেকে মুক্ত করতে পারিনি। জানি না সড়ক দুর্ঘটনার এই ভয়াবহ থাবায় আর কত মায়ের সন্তানকে প্রাণ দিতে হবে? কত মায়ের সন্তান হারানোর আর্তনাদের ফলে এই দেশের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠবে! আর কত স্বপ্নের সমাধি হবে যানবাহনের চাকার নিচে? আর কত তাজা তাজা প্রাণের রক্তে রঞ্জিত হবে রাজপথ? আর কত পরিবারকে তাদের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বনকে হারিয়ে পথে বসতে হবে?
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে চলতি বছরের প্রথম ৪ মাসে ১ হাজার ৮৭১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ১২৩ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৫৫৮ জন আহত হয়েছেন। আমরা জানি সৃষ্টিকর্তার নিয়মে আমাদের সবাইকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে কিন্তু তাই বলে কি সড়ক-মহাসড়কে এভাবে অকালে প্রাণ হারাব! এই মহামারীর শেষ কোথায়? জীবনের প্রয়োজনে আমাদের সমাজের প্রত্যেককেই কোনো না কোনো গন্তব্য যেতে হয় কিন্তু যাতায়াতের ক্ষেত্রে আজ আমরা নিরাপদ নই। আমাদের জীবনের নিরাপত্তা বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন এর জন্য আমাদের সমাজের পথচারী এবং যানবাহনের চালক উভয়পক্ষের অসচেতনতাই দায়ী। সড়ক দুর্ঘটনাগুলো ঘটার অন্যতম কারণ হচ্ছে:চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, সড়কগুলোতে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল, চালকদের মধ্যে বিনা কারণে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতা, বেপরোয়াগতিতে গাড়ি চালানো, লাইসেন্সবিহীন চালক বা অযোগ্য ব্যক্তিকে লাইসেন্স দেওয়া, ড্রাইভারদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা, রাস্তার ফুটপাতে অবৈধ স্থাপনা ও দোকান, গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ফুটওভারব্রিজ ও জেব্রাক্রসিংয়ের ব্যবস্থা না থাকা এবং যেসব জায়গায় রয়েছে পথচারীদের দ্বারা তা ব্যবহার না করা, রাস্তা পারাপারের সময় সাধারণ পথচারীদের দ্বারা মোবাইল ফোনে কথা বলা, কানে হেডফোন ব্যবহার করে গান শোনা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করাও তার মধো অন্যতম। তাছাড়া এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, সড়ক দুর্ঘটনার ৫৩ % ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য এবং ৩৭% চালকের বেপরোয়া গতির কারণে। সড়ক দুর্ঘটনার ফলে আমরা শুধু আমাদের সমাজের প্রিয়মুখগুলোকে হারাচ্ছি না এর প্রভাব আমাদের পারিবারিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনেও পড়ছে। পরিবারগুলো হারাচ্ছে তাদের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বনগুলোকে। সন্তানাদি বঞ্চিত হচ্ছে তাদের মাতা-পিতার ভালোবাসা থেকে। অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটছে। বিআরটিএ-র এক জরিপ মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাই এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের সকলকে এখনই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর হতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নও করতে হবে। ঘুষের বিনিময়ে অযোগ্য চালকদের লাইসেন্স প্রদান করার নীতি পরিহার করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশদেরকে তাদের দায়িত্ব দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পালন করতে হবে। পথচারীদের রাস্তা পারাপারের সময় হেডফোন ব্যবহার ও ফোনে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
জীবন আমাদের তা রক্ষার দায়িত্বও আমাদের। আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে মহাসড়কগুলোকে মানুষের তাজা রক্তে রক্তাক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
