করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সারা পৃথিবীর সঙ্গে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে আমাদের দেশও। গত মার্চ মাসে দেশে করোনা শনাক্তের পর সরকার মানুষের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। ফলে স্থবির হয়ে যায় দেশের সকল ধরনের অর্থনৈতিক কাজ, বন্ধ হয়ে যায় নগরের নিম্নআয়ের বস্তিবাসী গৃহকর্মীদের কাজ। এতে রাজধানীর শ্রমিকদের প্রায় ৮০ ভাগ আয় কমে যায়। এই শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছেন—গৃহশ্রমিক, রিকশা ও ভ্যানচালক, ছোট ব্যবসায়ী, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, ড্রাইভার, হেলপারসহ আরো বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বেসরকারি হিসাব মতে, ঢাকা শহরে বিভিন্ন বস্তিতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বা ১০ লাখ বস্তিবাসী পরিবার অমানবিকভাবে বসবাস করছেন। এই ১০ লাখ পরিবারের মধ্যে প্রায় ৪-৫ লাখ নারী শহরের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী (ছুটা বুয়া) হিসেবে কাজ করে জীবিকানির্বাহ করেন। তাদের গড়ে মাসিক আয় ২০০০-৬০০০ টাকা। এর বাইরেও ঢাকার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে স্থায়ী গৃহশ্রমিক রয়েছেন। কিন্তু করোনার চার মাস অতিবাহিত হলেও বস্তির গৃহকর্মীরা তাদের পূর্বের কাজে ফিরতে পারছেন না। ঢাকা শহরের এই বিশাল গৃহকর্মীরা এখন অমানবিক জীবনযাপন করছেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) গত ৭ জুন এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে জানা যায়, করোনার কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার ৩৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে, করোনার আগে যেটা ছিল ১৮ ভাগ। গত ২৪ জুন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস) এর তথ্য মতে, করোনার কারণে দেশে ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে যোগ হয়েছে। তারা আরো বলেছেন, শহরের শ্রমিকের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ।
গৃহকর্মী স্মৃতি বেগম আগারগাঁও থেকে রিং রোডে এসে কাজ করেন। এতদূর থেকে এসে কাজ করার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমার আশপাশের বিল্ডিংয়ে কাজের বুয়া ঢুকতে দেয় না। আর স্বামী গাড়ি চালাতেন, এখন চাকরি নাই। দুই ছেলেসন্তান নিয়ে খুব কষ্টে আছি, হ্যার লাইগ্যা এতদূর কামে আসি।’ শাহেদা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী নাই, আগে পাঁচ বাসায় কাম করতাম। মাসে ১২ হাজার ট্যাকা কামাইতাম। এখন কোনো কাম নাই, ছোট বাচ্চা নিয়া খুব কষ্টে আছি। ফ্ল্যাট বাসায় ঢুকতে দেয় না। মেসে রান্নার কাম করতাম, মেস বন্ধ, কামও বন্ধ। কোনো রকমে বাইচা আছি।’
সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনেরা বলেছেন, নগরের বস্তিবাসী গৃহকর্মীদের আয়ের ৭০ ভাগ চলে যায় বাসা ভাড়ায়। বস্তিতে যেহেতু হোল্ডিং ট্যাক্স দেওয়া লাগে না, তাই বস্তির মালিকদের ভাড়া কম নেওয়ার বিষয়ে আরো সংবেদনশীল হতে হবে। গৃহকর্তাদের সংবেদনশীল হতে হবে এবং গৃহকর্মীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা উপকরণ দিয়ে তাদের কাজে ফিরিয়ে নিতে হবে। স্বাস্থ্যসুরক্ষা মেনে চললে এই ভাইরাসের হাত থেকে অনেকাংশে রেহাই পাওয়া যাবে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ বলেন, নিম্নআয়ের মানুষদের কাজে ফিরিয়ে আনতে না পারলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ আকারে অপরাধ বেড়ে যাবে এবং এর শিকার হব আমরা সবাই। আমি আমার বাসার গৃহকর্মীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজে অব্যাহত রেখেছি এবং আমরা করোনা থেকে মুক্ত আছি।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) চেয়ারপারসন আবু নাসের খান বলেন, করোনা দুর্যোগের ফলে বেকার হয়ে যাওয়া নিম্নআয়ের মানুষেরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তাদের সন্তানেরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় কবে ফিরে যেতে পারবে তা আমাদের জানা নেই। একটি বিশাল মানুষের কর্মহীন হয়ে যাওয়া জাতীয় অর্থনীতিতেও ব্যাপক ক্ষতি তৈরি করছে। এর থেকে উত্তরণের উপায় চিন্তা করতে হবে।
