সানেমের জরিপ প্রতিবেদন
ইত্তেফাক রিপোর্ট
করোনা পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ে টিকে থাকার লক্ষ্যে সরকার ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও দুই-তৃতীয়াংশই এই সুবিধার বাইরে। ৩৪ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এই সুবিধার আওতায় ঋণ নিতে পেরেছে। প্রণোদনা সুবিধা না পাওয়ার পেছনে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং ব্যাংকিং জটিলতাকে অন্যতম সমস্যা হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা। এছাড়া প্রণোদনা সংক্রান্ত তথ্যের জটিলতা এবং ঘুষ চাওয়ার মতো বিষয়ও রয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। দেশের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ওপর ঐ জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপে উত্পাদন ও সেবাখাতের ৩০৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। গতকাল শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জরিপ প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। অনলাইন ব্যবস্থায় আয়োজিত ঐ অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনিশ, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান ছাড়াও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও অর্থনীতিবিদরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা শুরু হওয়ার পর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসের তুলনায় পরবর্তী প্রান্তিকে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। তবে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে তারা এখনো বড় বাধা হিসেবে দেখছেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. মসিউর রহমান বলেন, যাদের উদ্দেশ্যে প্রণোদনা সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তাদের কাছে সেটা যাচ্ছে কি না—তা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেখা দরকার। কোনো ব্যত্যয় হলে যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রণোদনার অর্থ পেয়েছেন এমন ৮৭ জনই জানিয়েছেন, ব্যবসায়ের জন্য প্রণোদনার অর্থ অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু বেশির ভাগই এই প্রণোদনার অর্থ নিতে পারছেন না। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ উঠে এসেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৮৪ শতাংশই মনে করেন, তার শিল্পের জন্য কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ নেই। ৮২ শতাংশ মনে করেন, এটি কোনো প্রকৃত অর্থে অনুদান নয়। ৮০ শতাংশ মনে করেন, এটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া এবং ৭৮ শতাংশ মনে করেন, ব্যাংকসংক্রান্ত জটিলতার কারণে এ সুবিধা নেওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য ১২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের তরফে কোনো জটিলতা দেখছেন না। এছাড়া তথ্যগত জটিলতার কারণে বুঝার সমস্যায় প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ না পাওয়াকে কারণ হিসেবে দেখছেন ৬৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। আবার ২৮ শতাংশ মনে করেন, যে অর্থ পাওয়া যাবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। অন্যদিকে ২৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী প্রণোদনার অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ চাওয়াকে একটি কারণ হিসেবে দেখছেন। ২৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা এ ধরনের পরিস্থিতি দেখেননি। আর এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি ৫৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। এছাড়া বন্দর ও শুল্ক সংক্রান্ত সমস্যাসহ লজিস্টিক ইস্যু, করোনা সংকটকে সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে না পারা, শিল্পে সরকারের সহযোগিতা সংক্রান্ত ইস্যু, কর কাঠামো, অর্থায়নের জটিলতাসহ বেশ কিছু সমস্যা উঠে এসেছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ী নেতারা প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বেশ কিছু দুর্বলতা তুলে ধরেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বিদ্যমান নীতিমালায় সংস্কার আনার তাগিদ দেন। ব্যবসা ও বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। সরকার চলতি অর্থবছর ৪৮ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে রপ্তানি। এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহীম, এমসিসিআইর সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবীর, পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ, এমসিসিআইর সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর প্রমুখ।
