কোভিড-১৯ ঘিরে প্যানিক ক্যাম্পেনের শুরু থেকেই বলা হতে থাকে যে—এই ভাইরাসটি সত্যি সত্যিই ভয়ংকর, কারণ এর কোনো চিকিত্সা নেই। ফলে, অ্যান্টি-সিকিউ/এইচসিকিউ আন্দোলনের হাওয়া বইতে শুরু করে। যেমন—গত ১৩ জানুয়ারি সেই সময়কার ফরাসি স্বাস্থ্যমন্ত্রী আগনেস বুজিন ঘোষণা দেন যে, ‘সিকিউ’—‘বিষাক্ত বস্তু’, কাজেই এই মুহূর্ত থেকে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিষটি কেনা যাবে না। চমকপ্রদ পদক্ষেপ নয় কি? গত ৬৫ বছর ধরে ফরাসিরা যে ওষুধ কিনছে সেটি হঠাত্ বিষ হয়ে গেল! বয়সের বিচারে প্রৌঢ় ‘সিকিউ’ তবে বিষ?
মার্চ মাসে কোভিড-১৯ ইউরোপের জীবনযাত্রাকে নৈরাশ্য ও বিভ্রান্তিকর অবস্থার মধ্যে নিয়ে আসে। এই নৈরাশ্যের ডামাডোলের মধ্যে ফরাসিরা শুনল, হাসপাতালগুলোর জন্য যে কেন্দ্রীয় ওষুধখানা রয়েছে, সেখান থেকে ‘সিকিউ’-এর সম্পূর্ণ মজুত লোপাট হয়ে গেছে।
অতি সস্তা মূল্যের ‘সিকিউ’ কিনা সরকারি গুদামখানা থেকে উধাও হয়ে যায়! বিশ্বাসযোগ্য কি? ফ্রান্সের ক্লাস ওয়ান কোয়ালিটির সংক্রমণ ব্যাধির ডাক্তার ও মাইক্রোবায়োলজিস্ট ডিডের রাউল্ট। কোথায় তিনি? ডা. রাউল্ট তখন সরকারি সিদ্ধান্তের থোরাই কেয়ার করি মেজাজে ‘সিকিউ/এইচসিকিউ’ ও সঙ্গে ‘অ্যাজিথ্রোমাইসিন’ সংযুক্ত করে কোভিড রোগীর সফল চিকিত্সায় ব্যস্ত রয়েছেন। ডা. রাউল্ট সুস্থ-অসুস্থ নির্বিশেষে ঢালাও লকডাউনের বিরোধিতা করেন, ব্যাপক হারে গণ টেস্টের সমর্থন করেন এবং আক্রান্তকে ‘সিকিউ/এইচসিকিউ’ দিয়ে দ্রুত চিকিত্সার পক্ষে কাজ করে যান। ‘গাঁয়ের ফকির ভিখ পায় না’ স্টাইলে রাউল্টকে পাত্তা না দিয়ে ’প্রফেসর লকডাউন’ ফার্গুসনের ‘লকডাউন’ বসানো হলো ফ্রান্সে। তবে খুব শিগিগরই লকডাউনের নির্মম ঝাপটা ফ্রান্স হাড়ে হাড়ে টের পেতে থাকে।
যা হোক, রাউল্ট চীনা কোভিড-১৯ বিশেষজ্ঞ ‘জাং নানশান’-এর পদ্ধতি মতো ‘সিকিউ/এইচসিকিউ’ প্রয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ করেন। আর বলাই বাহুল্য যে, প্রফেসর রাউল্টকে বিবিধ উপায়ে ভীতিপ্রদর্শন ও মৃত্যু হুমকি দেওয়া হয়। ইত্যবসরে ইলন মাস্কের এক টুইটারে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন যে, সব আমেরিকানদের জন্য ‘সিকিউ’ চাই। ঐতিহ্যগতভাবে ম্যালেরিয়া-চিকিত্সায় ‘সিকিউ’ ব্যবহার হয় এবং যারা ‘সিকিউ’র প্রতি সংবেদনশীল সে সব কেসের জন্য ব্যবহার হয় ‘এইচসিকিউ’। ‘এইচসিকিউ’-এর নির্মিত বা স্ট্রাকচার ‘সিকিউ’-এর সদৃশ। এই একই ওষুধই আবার ‘লাপাস’ ও ‘রিমাটোয়েড আরথ্রাইটিস’ চিকিত্সায় একমাত্র ওষুধ। তাই কোভিডের দিনগুলোতে একমাত্র ওষুধ ‘সিকিউ’/ ‘এইচসিকিউ’র সাপ্লাই সমস্যায় আতঙ্কিত ভুক্তভোগীরা সামাজিক মিডিয়াগুলোতে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন।
সাধারণভাবে কোভিডের মৌসুমে কোভিড চিকিত্সায় ‘সিকিউ/এইচসিকিউ’ ব্যবহারের বিজ্ঞানভিত্তিক গুণাবলি বা কোয়ালিটিকে বিবেচনা করার পরিবর্তে, নির্জলা রাজনীতি বা অর্থনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে পক্ষপাতমূলক আলোচনা আনুকূল্য পায়। ফলস্বরূপ, ‘সিকিউ/এইচসিকিউ’ ব্যবহারের সত্যতা ও যথার্থতার প্রতি দায়িত্ববোধ আর থাকে না, পরিবর্তে বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের ঘোষণায় ভিন্ন মেজাজের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধতার প্রকাশ ঘটে। যেমন : ব্রাজিলের সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোভিড চিকিত্সার একমাত্র ‘ম্যাজিক ফর্মুলা’ হলো ‘সিকিউ/এইচসিকিউ’, ট্রাম্পের বিবেচনায়ও তা-ই। অপরদিকে, অ্যান্টি-‘সিকিউ/এইচসিকিউ’র বিপক্ষেও শক্তিশালী দলের আবির্ভাব ঘটে। ফ্রান্স এই ওষুধ ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে, ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কেনা যাবে না—জানানো হয়। ‘সিকিউ/এইচসিকিউ’র যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে রোগীর সুস্থ হওয়ার উপাত্ত থাকলেও, ওষুধ দুটোর বিরুদ্ধে মৃত্যুসহ বিবিধ ভয়ংকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কাহিনিতে সব ধরনের মিডিয়ায় ছয়লাপ হতে থাকে। ডা. অ্যান্টনি ফাউচি স্পষ্ট বক্তব্য দেন যে, কোভিড-১৯-এর কোনো চিকিত্সা নেই। করোনা ভাইরাস-সংশ্লিষ্ট চিকিত্সায় ‘এইচসিকিউ’-এর ব্যবহারের ওপরে কখনো কোনো গবেষণা/স্টাডি হয়নি, ‘এটি পরীক্ষিত ওষুধ নয়’, ‘যথেষ্ট পরিচিত ওষুধও নয়’। এই প্রচণ্ড বেপরোয়া ইনফো-যুদ্ধের প্লাবনে বিভ্রান্ত বিশ্ববাসীর মন-মানসিকতা কেমন হতে পারে, ভাবুন তো! এ সময় আরেকটি ইনফো-বোমা বিস্ফোরিত হয়, ল্যানসেটের মতো খ্যাতনামা বিজ্ঞান জার্নাল ২২ মে ‘সার্জিস্ফিয়ার’ নামক স্বল্প-পরিচিত এক করপোরেশনের ‘স্টাডি’ প্রকাশ করে। বিষয়বস্তু : ‘এইচসিকিউ’-এর মূল্যায়ন। এই স্টাডিতে সার্জিস্ফিয়ার : বিশ্বব্যাপী ৬৭১টি হাসপাতালে অবস্থানরত ৯৬ হাজার ৩২ জন কোভিড রোগীর উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এক ভয়ংকর সত্যপ্রাপ্তির ফলাফল প্রকাশ করে। বলে যে, কোভিড-১৯ আক্রান্ত ঘোরতর রোগীকে যদি ‘সিকিউ/এইচসিকিউ’ দিয়ে চিকিত্সা করা হয় তো সেই রোগীর হয় মৃত্যু হবে অথবা তার হূিপণ্ডের ধুকপুকানি বিপজ্জনকভাবে অনিয়মিত হবে। বলাই বাহুল্য যে, তত্ক্ষণাত্ যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো ‘ভয়ংকর সিকিউ/এইচসিকিউ’ নিষিদ্ধ করে দেয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই দলে যোগ দেয়।
অবশ্য অচিরেই দেখা গেল যে, এই স্টাডিতে যে উপাত্ত ভান্ডার ব্যবহূত হয় সেটি আসলে ছিল কোনো গ্যারেজে অথবা চিলেকোঠায় তৈরিকৃত উপাত্তভান্ডার। অন্যভাবে আরেকটি ভাঁওতাবাজি, বিজ্ঞানের নামে বদমাশি একটি। ল্যানসেট ও নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন তখন তড়িঘড়ি ‘সার্জিস্ফিয়ার’-এর স্টাডিটি জার্নাল থেকে তুলে নেয়। প্রবঞ্চনামূলক এই ‘স্টাডির’ সঙ্গে জড়িতরা ক্ষমাপ্রার্থনা করে। সর্বশেষ চাপের মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথমে বলে, ব্যবহার কর, পরে বলে অকেজো হলেও ওষুধটি ব্যবহার করতে পার।
দুই প্রফেসর রাউল্ট ও ফাউচির মধ্যে পার্থক্য হলো যে : প্রথম জন বলছেন—যত পার টেস্ট কর, অজস টেস্ট কর এবং ‘সিকিউ/এইচসিকিউ’সহ যা কিছু আছে তাই দিয়ে আগে রোগীকে সুস্থ কর, দ্বিতীয় জন বলছেন : অত টেস্ট করার দরকার নেই এবং কোভিড-১৯-এর কোনো চিকিত্সা নেই। অর্থাত্ ট্রাম্প যে ম্যালেরিয়া ওষুধকে ’গেম চেঞ্জার’ আখ্যা দেন ও গাদা গাদা ‘সিকিউ’ মজুত করেন, প্রফেসর ফাউচি তার ওপর বালতিখানেক ঠান্ডা জল ঢেলে দেন; কিন্তু ভুলোমনের ফাউচি বলতে ভুলে যান যে, ২০০২ সালে করোনা ভাইরাস ‘সার্স’-এর মহামারির সময়ও ‘সিকিউ’ ব্যবহার হয় ও পরীক্ষিত হয়। প্রফেসর মার্টিন ভিনসেন্ট ও তার টিম পরিচালিত স্টাডির রিপোর্টটি সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) ‘পিয়ার রিভিউড ভাইরোলজি জার্নালে ‘প্রকাশিত হয়েছিল। ১৫ বছর পূর্বে অর্থাত্ ২২ আগস্ট ২০০৫ সালে প্রকাশিত রিপোর্টের টাইটেল ছিল : ‘সার্স করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও ছড়িয়ে পড়তে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রবল বাধা প্রদানকারী এজেন্টের দক্ষতা ক্লোরোকুইনের রয়েছে।’ সেই থেকে সিডিসির অনুমোদন তালিকায় ক্লোরোকুইন ওরফে ‘সিকিউ’ অবস্থান করছে। ‘সিকিউ/এইচসিকিউ’কে ঝেঁটিয়ে ওষুধ-রাজ্য থেকে বের করার এই প্রয়াসের অর্থায়ন যে বা যারাই করুক না কেন এবং উন্নত পশ্চিমা জগতের প্রভাবশালী দল ওষুধটিকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বটে; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, কোভিড-১৯ চিকিত্সায় ‘সিকিউ/এইচসিকিউ’-এর চিকিত্সাগুণের হেরফের হচ্ছে। না, হচ্ছে না।
বর্তমানে বিশ্বের ২৫টি বিগ ফার্মা কমপক্ষে ১২০টি টিকা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। খুব তাড়াহুড়োর ম্যারাথন এটি। কোভিড-১৯-এর টিকা আরেকটি ‘ফ্লু টিকা’ হবে, অবশ্য করোনা ভাইরাস মাত্রই ‘বহুরূপী’ (ডিএনএ সিকোয়েন্সিং), অর্থাত্ প্রতি বছর নিতে হবে এবং এই জাতীয় টিকা হয়তো ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পরিমাণ সংক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম। তবে ভয়ংকর বাস্তবতা হলো যে, হরহামেশাই ওষুধ ও টিকা মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বাহক হয়ে থাকে। যেমন : ২০০৯ সালের সোয়াইন ফ্লুর টিকা ‘পান্ডেম্রিকসটিডি ও আরেপানরিকসটিডি’, তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহূত ‘ডিপো-প্রভেরা’ (গর্ভনিরোধক ইনজেকশন), ‘নরপ্ল্যান্ট’ (গর্ভনিরোধক ইমপ্ল্যান্ট) ইত্যাদি আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোতে ব্যবহূত ‘ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন’ (ওপিভি) বা প্রধানত আফ্রিকার শিশুদের জন্য ব্যবহূত ‘ডিটিপি’ টিকা ইত্যাদি—এরকম আরো দৃষ্টান্ত রয়েছে। সাধারণত, ওষুধ/টিকার ক্লিনিক্যাল টেস্টের তৃতীয় পর্ব পরিচালনার জন্য তৃতীয় বিশ্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কোভিড-১৯ টিকার ক্ষেত্রেও অন্যথা হবে না। বিগ-ফার্মাগুলো বলেছে : তারা ‘নিরাপদ’ টিকা বানাচ্ছে। তবে অবাঞ্ছিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার (আর্থিক) খেসারতের দায়িত্ব থাকবে সরকারের, কোম্পানির বিরুদ্ধে কোর্টকাচারি করা যাবে না।
কিন্তু আফ্রিকায় খাদ্যাভাবে প্রতি দিন ২২ হাজার শিশু মারা যাচ্ছে এবং খাদ্যাভাব ও দূষিত পানীয় জলে সংক্রমিত হয়ে বছরে ৫ মিলিয়নের অধিক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, অধিকাংশই শিশু। ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্তদের ‘ওয়ার্প স্পিডের’ টিকা কি টিকিয়ে রাখতে পারবে?
n লেখক : বিজ্ঞানলেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
