বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়
মো. আতিকুল ইসলাম (জাহিদ)
সহকারি শিক্ষক
রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, রাজশাহী
স্বাধীন বাংলাদেশ
নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
জনাব ফারুক তাঁর বাবাকে লিখেছিলেন ‘বাংলার নিরীহ জনতার ওপর নরপিশাচ রক্তপিপাসু সৈন্যরা যে অকথ্য বর্বর, অত্যাচার আর পৈশাচিক হত্যালীলা চালাচ্ছে, তা জানা সত্ত্বেও আমি বিগত একমাস পিঁচশ দিন যাবত ঘরের মধ্যে বিলাস বাসনে মত্ত থেকে যে ক্ষমাহীন অপরাধ করেছি, আজ সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য যাত্রা শুরু করলাম’।
ক. কত তারিখ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে?
খ. জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকে কোন ঐতিহাসিক ঘটনার ইঙ্গিত রয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. তুমি কি মনে করো উক্ত ঐতিহাসিক ঘটনাটি ছিল একটি গণযুদ্ধ? তোমার উত্তর স্বপক্ষে যুক্তি দাও।
ক. উত্তর: ১৯৭১ সালের ২২ শে ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।
খ. উত্তর: শিশুদের সুরক্ষা ও তাদের জীবন বিকাশে বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালে জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ প্রণয়ন করেছে।
এ নীতি অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সকল ব্যক্তিই শিশু। জবরদস্তিমূলক ভারী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের ব্যবহারে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ নীতিতে পথশিশু ও বিপথগামী শিশুদের বিকাশে পৃথক ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
গ. উদ্দীপকে যে ঐতিহাসিক ঘটনার ইঙ্গিত রয়েছে তা হলো ১৯৭১ সালে সংঘটিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূচনালগ্ন থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সার্বিকভাবে শোষিত হয়ে আসছিল। নানা ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের শিকার হয়ে বাঙালিরা শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে।
যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের গণহত্যা, ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ মাধ্যমে। ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা বহু মানুষকে হত্যা করে। পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প, পিলখানা ইপিআর ক্যাম্প, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আক্রমণ চালায় এবং নৃশংস গণহত্যা পরিচালনা করে। দীর্ঘ নয়মাস যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব-পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালায়। বহু নারী পাকবাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত হয়। নারী, পুরুষ, শিশু, যুবক, বৃদ্ধ সকল বয়সের মানুষদেরই তারা নির্বিচারে অত্যাচার আর পৈশাচিক হত্যালীলা চালায়। যা দেখে সহ্য করতে না পেরে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এই দেশের জনগণ এবং দেশকে স্বাধীন করে।
উদ্দীপকে জনাব ফারুক তাঁর চিঠিতে বাংলার নিরীহ জনতার ওপর পাকসেনা কর্তৃক অকথ্য বর্বর অত্যাচার আর পৈশাচিক হত্যালীলা সম্পর্কে লিখেছেন। যেহেতু ১৯৭১ সালে পাক সেনা কর্তৃক অকথ্য বর্বর অত্যাচার আর পৈশাচিক হত্যালীলা হয় এবং জনাব ফারুকের চিঠি এই সম্পর্কিত তাই বলা যায় উদ্দীপকে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইঙ্গিত রয়েছে।
ঘ. উত্তর: উদ্দীপকে উল্লেখিত ঐতিহাসিক ঘটনাটি হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। আমি মনে করি এ ঘটনাটি অর্থাত্ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি গণযুদ্ধ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণ অংশগ্রহণ করে। কৃষক থেকে শুরু করে পুলিশ আনসার, রাজনীতিবীদ, পেশাজীবী এমনকি ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ্যযোগ্য। তাই এ যুদ্ধকে জনযুদ্ধ বা গণ যুদ্ধ বলা হয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতের ঘটনার পর বাঙালিরা চুপ করে থাকে নি। সর্বস্তরের বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল জনগণ। তাই যুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র, পেশাজীবী, নারী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রধান রাজনৈতিক দল হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধের গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদান, ভারতে ১ কোটি শরণার্থীর ত্রাণব্যবস্থা, মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলা প্রশিক্ষণ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টি ইত্যাদি কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে রাজনৈতিক দল। মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা পালনকারী দলগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতীয় কংগ্রেস, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি। এছাড়া পরিকল্পনা সেল গঠন করে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সরবরাহ করে পেশাজীবী শ্রেণি। তারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধে একক গোষ্ঠী হিসেবে ছাত্র ছাত্রীদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনী গঠিত হয়েছিল ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তারা যেমন রনাঙ্গনে যুদ্ধ করেছে তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা শুশ্রুষা করে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে ছিনিয়ে আনতে সাহায্য করে। মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখতে বিভিন্ন গণমাধ্যম, প্রবাসী বাঙালি ও শিলপী সাহিত্যিক ভূমিকা রাখে। সাধারণ জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের ঔষধ খাবার দিয়ে, শত্রুর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেয়ার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে অনেক ক্ষুত্র নৃগোষ্ঠী জনগণ ও অংশ নেয়। সকল স্তরের জনগণের সাহায্য ও সহযোগিতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে মাত্র নয় মাসে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। উদ্দীপকের জনাব ফারুক ও তার চিঠির মাধ্যমে নিজের মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন। এভাবে জনাব ফারুকের মতো অসংখ্য মানুষের অংশগ্রহণ মুক্তিযুদ্ধ গণযুদ্ধতে পরিণত হয়।
