ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, সংসদীয় আসনভিত্তিক থোক বরাদ্দে গৃহীত পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে কার্যকর তদারকির ঘাটতি রয়েছে। সংসদ সদস্যের সততা ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট আচরণবিধির ঘাটতির কারণে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণকে আরো উত্সাহিত হচ্ছে। এছাড়া সংসদ সদস্যের একাংশের জন্য এসব প্রকল্প স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চা, নির্বাচনে ভোট নিশ্চিত করার চেষ্টা ও অনৈতিকভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের পথ হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।
‘সংসদীয় আসনভিত্তিক থোক বরাদ্দ:অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষ্যে গতকাল বুধবার আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেছে সংস্থাটি। থোক বরাদ্দে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নয় দফা সুপারিশ প্রস্তাব করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা—নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের প্রমুখ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, আইআরআইডিপি ১ (২০১০ থেকে ২০১৫) প্রকল্পে সংসদীয় আসন প্রতি ৩ কোটি টাকা করে পাঁচ বছরে ১৫ কোটি টাকা এবং আইআরআইডিপি ২ (২০১৫ থেকে ২০২০) প্রকল্পে আসন প্রতি ৫ কোটি টাকা করে চার বছরে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ একনেকে অনুমোদন করা হয়েছে। এই থোক বরাদ্দের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর অধীনে প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা ও নির্দেশিকা না থাকলেও বিগত দুটি সংসদে এই বরাদ্দ সরাসরি অনুমোদনের মাধ্যমে এটি একটি চর্চায় পরিণত হয়েছে। ফলে স্কিম নির্বাচন প্রক্রিয়া, এলাকার চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ বণ্টনের পূর্বশর্ত নির্ধারণ, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রক্রিয়ায় ঘাটতি লক্ষণীয়।
গবেষণায় দেখা যায়, কোনো কোনো এলাকায় সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের কাছে বছরে ২০-২৫ শতাংশ কাজ বিক্রি (অবৈধভাবে সাব-কন্ট্রাক্ট) হয়, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে সাব-কন্ট্রাক্টের কোনো প্রমাণ রাখা হয় না। এছাড়া স্বজনপ্রীতি, ঠিকাদারের কাছ থেকে কমিশন বা লভ্যাংশ প্রাপ্তি এবং ঠিকাদারদের মাধ্যমে ভোটের সময় ও ক্ষমতাসীন থাকাকালীন এলাকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ফলে সংসদ সদস্যের একাংশ কর্তৃক তদারকির ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় অংশীজনদের পারস্পরিক সুবিধা সমঝোতায় আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ঠিকাদার নিম্নমানের কাজ করে লাভবান হন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্যগণের মূল দায়িত্ব হলো আইন প্রণয়ন করা, জনগণের হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। যদি সংসদ সদস্যগণ সরকারি ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদিসহ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন তাহলে তাদের যে মূল দায়িত্ব সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, তা সম্ভব হয় না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এ ধরনের স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিরসনমূলক সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালা এবং জনপ্রতিনিধিদের জন্য কঠোর শুদ্ধাচার ও নৈতিক আচরণ প্রণয়ন করতে হবে এবং কঠোরভাবে এর বাস্তবায়ন করতে হবে, তাহলেই এর থেকে পরিত্রাণ সম্ভব।
এই গবেষণায় পদ্ধতিগত দৈবচয়নের মাধ্যমে ৫০টি সংসদীয় আসনের থেকে আইআরআইডিপি-১-এর ৪৬৪টি স্কিম এবং আইআরআইডিপি-২-এর ১৬৪টি স্কিম অর্থাত্ মোট ৬২৮টি স্কিম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া মোট ৩৪১ জন মুখ্য তথ্যদাতার সাক্ষাত্কার এবং মোট ১৮০টি দলীয় আলোচনার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
