জনপ্রতিনিধির দায়ও বুঝিতে হইবে

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২০, ২১:১৯

কেহ কেহ অভিযোগ করেন, উন্নয়ন ও রাজনীতি একাকার হইয়া গিয়াছে। প্রশ্ন তুলিয়া থাকেন জনপ্রতিনিধিদের অর্থ বরাদ্দ লইয়া। তবে দুঃখের বিষয়, এই সকল মন্তব্য করিবার পূর্বে তাহারা দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখেন না। সকল রাজনীতিক বা জনপ্রতিনিধিই ধোয়া তুলসীপাতা নহেন, ইহা আমরাও স্বীকার করি। কাহারো কাহারো অসচ্ছতা নাই তাহাও বলা যাইবে না। কিন্তু ঢালাও মন্তব্য করা যাইবে না। তাহা গ্রহণযোগ্য নহে। জনপ্রতিনিধিদের কাজকর্ম বুঝিতে হইলে হয় রাজনীতির মাঠের অভিজ্ঞতা থাকিতে হয়, অথবা গভীরভাবে বাস্তবতার নিরিখে পর্যবেক্ষণ করিতে হয়। এই ক্ষেত্রে রাজনীতির আদর্শলিপি পাঠ করাও জরুরি। তাহার পরেই মন্তব্য করিলে সেই মন্তব্য মূল্যবান হইতে পারে। অনেকেই মন্তব্য করেন তত্ত্ব বা থিওরির উপর ভিত্তি করিয়া। কিন্তু তত্ত্ব আর বাংলাদেশের বাস্তবতার মধ্যে যে গভীর ফারাক রহিয়াছে, তাহা বিবেচনায় আনা জরুরি বইকি। আবার ইহাও মনে রাখা প্রয়োজন যে সরকারব্যবস্থা, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে যত তত্ত্ব রহিয়াছে তাহার অধিকাংশই পশ্চিমা অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশে সৃষ্ট। প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সেই তত্ত্ব একটি উন্নয়নশীল দেশে কতটা খাপ খাইতে পারে, তাহা বিবেচনায় রাখাও জরুরি। সুতরাং সকল দিক বিবেচনায় না রাখিয়া কোনো কথা বলিয়া দিলেই তাহা যে বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হইবে, এমন কোনো কথা নাই। যেমন ধরা যাউক, সংসদ সদস্যদের থোক বরাদ্দের বিষয়টিই। পূর্বে ইহা ছিল ২ কোটি টাকা। বর্তমানে করা হইয়াছে ৪ কোটি। এই সম্পর্কে সরকারের সুস্পষ্ট বক্তব্য হইল, থোক বরাদ্দের টাকা একজন সংসদ সদস্য তাহার নিজের পছন্দমতো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করিতে পারিবেন। ইহা সম্পূর্ণ তাহার এখতিয়ার। সরকারের এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতার নিরিখে বলিয়াই মনে করিতে হইবে।

স্থানীয় পর্যায়ে কাজের বিনিময়ে খাদ্য, বয়স্ক ভাতা এবং নানা ধরনের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীসহ কমপক্ষে ৪০ ধরনের প্রকল্প রহিয়াছে। এই সকল প্রকল্প হইতে কাহারা সুবিধা বা অগ্রাধিকার পাইবেন তাহা স্বাধীনভাবে বিবেচনার সুযোগ একজন সংসদ সদস্যের রহিয়াছে। জানিতে হইবে, এলাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানে সংসদ সদস্যের সম্পৃক্ততা থাকে। ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে নানামুখী সমস্যার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যকে অগ্রাধিকার বিবেচনা করিতেই হয়। সেই সঙ্গে ইহাও সত্য, তিনি একজন রাজনীতিবিদ। রাজনৈতিক বিবেচনাও তাহাকে করিতে হয় এবং ইহাই স্বাভাবিক। যুক্তরাষ্ট্রসহ যেই সকল দেশ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা লইয়া তত্ত্ব দিয়া থাকে, সেই সকল দেশের জনপ্রতিনিধিদেরও এই রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠিবার সুযোগ থাকে না। ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় ‘নুন আনিতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা রহিয়াছে। শুধু বিপরীত দিকে দাঁড়াইয়া দেখিলে সঠিক চিত্র পাওয়া যাইবে না। বিবেচনায় রাখিতে হইবে, বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্যকে একপ্রকার পিঠে বস্তা বাঁধিয়া সাঁতার কাটিতে হয়। আরো তিক্ত বিষয় হইল, যাহারা সরকার পরিচালনা, সরকার পদ্ধতি পর্যবেক্ষণের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করিয়াছেন তাহাদের মধ্যে অভিযোগ করাও একটি স্টাইল হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আমরা তাহাদের সার্বিক বিবেচনা মাথায় রাখিয়া গঠনমূলক সমালোচনা করিতেই অনুরোধ জানাইব।