সমস্যাটি কাহারো একার নহে

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২০, ২১:২০

জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা ও খবর গত দুই শতকে ব্যাপক মাত্রায় আলোচিত হইয়াছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ ইহার সহিত জড়াইয়া রহিয়াছে আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। জলবায়ু পরিবর্তন লইয়া মতভেদেরও শেষ নাই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেমন মনে করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি আসলে মনগড়া; ইহা কোনো পরিবর্তন নহে, প্রকৃতির স্বাভাবিক স্বভাব-বদল, যুগে যুগে ইহা হইয়া আসিতেছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের যেই বাস্তবতা, তাহার পক্ষের বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন—পৃথিবীতে বরফ যুগ, উষ্ণ যুগ, বিবিধ প্রাকৃতিক পরিবর্তন অযুত-লক্ষ-নিযুত বত্সর ধরিয়া ঘটিয়া আসিতেছে; কিন্তু সেই পরিবর্তন হইয়াছে অতি ধীরে ধীরে, হাজার হাজার বত্সর ধরিয়া; কিন্তু সতেরো শতকে শিল্পবিপ্লবের পর মাত্র কয়েক শতকেই পৃথিবীর তাপমাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। ইহার কারণ জলবায়ুর পরিবর্তন। এই পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবে ঘটিতে হাজার হাজার বত্সর সময় লাগিত। এখন প্রশ্ন হইল, শিল্পবিপ্লবকে কি শাটডাউন করা সম্ভব? বলা যায় আধুনিক অতি উন্নত জীবনযাপন ও সভ্যতার যাবতীয় বৈশিষ্ট্য গড়িয়া উঠিয়াছে শিল্পবিপ্লবের হাত ধরিয়াই। সুতরাং চাহিলেই শিল্পকারখানা-সৃষ্ট গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসারণ বন্ধ করা সম্ভব নহে।

ইহা এক জটিল দ্বন্দ্ব; কিন্তু ইহাও নিষ্ঠুর বাস্তবতা যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের যেই সকল দেশ সবচাইতে অরক্ষিত অবস্থায় রহিয়াছে, বাংলাদেশ তাহার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। অনেক বত্সর ধরিয়াই বলা হইতেছে যে, বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ জলবায়ু পরির্বতনের ফলে ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়, প্রলম্বিত বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, দাবদাহ ও খরার মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হইতে থাকিবে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এই ব্যাপারে স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন, এই পরিবর্তনের ভয়াবহতা কোনো সাধারণ ভয়ের বিষয় নহে—ইহা নীরবে ভক্ষণ করিতে আসিয়াছে বিশ্বের বিভিন্ন জনপদকে। ইহা ঠিক যে, বন্যা আমাদের বদ্বীপ অঞ্চলের একটি নিয়মিত ঘটনা। আমাদের দেশে উজানে প্রচুর বৃষ্টি হইয়া থাকে, তাহাতে ধাইয়া আসে বন্যা। চীনেও এইবার ব্যাপক বন্যা হইয়াছে। অনেকেই মনে করেন এই বত্সর যেই ব্যাপক ও প্রলম্বিত বন্যা হইয়াছে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতে—তাহা ঐ জলবায়ু পরিবর্তনেরই আলামত। প্রকৃতপক্ষে, জলবায়ু পরিবর্তন যত দূরের ও ভাবিকালের বিষয় বলিয়া অনেকে মনে করিতেছিলেন, বর্তমান বাস্তবতা বলিতেছে, তাহা যেন এখন ক্রমশ স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে।

বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করিতেছেন, এই পরির্বতনের ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণীদের দিনপঞ্জিকায় আসিবে ব্যাপক পরিবর্তন। শরত্কাল আগাম আগমনের ফলে হয়তো কিছু কিছু উদ্ভিদের পাতা গজানো, ফুল ফোটা, প্রাণীর ডিম পাড়া পূর্বে বা পরে হইবে। সমুদ্রের তাপমাত্রা এবং পানির অম্লত্ব বৃদ্ধির কারণে সামুদ্রিক মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত, আবাসস্থলের পরিবর্তন ইত্যাদি হইতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পোকামাকড় ও জীবাণু বিস্তার এবং সংক্রামণের হারও বাড়িয়া যাইবে। ফলে রোগব্যাধির বিস্তার ও মহামারি জাতীয় ঘটনাও ঘনঘন ঘটিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতা মানিয়া লওয়া প্রয়োজন। কারণ, ইহাকে স্বীকার না করিলে সমাধানের জোর চেষ্টাও করা হইবে না। মনে রাখিতে হইবে, এই সমস্যা কাহারো একার নহে, সমগ্র বিশ্বের।