করোনার ধাক্কা সামলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় গত মার্চ থেকে বাংলাদেশের চিংড়ি রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাতিল হয়ে গিয়েছিল হাজার কোটি টাকার ২৯০টি ক্রয়াদেশ। গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে ৩ হাজার টন চিংড়ি কম রপ্তানি হওয়ায় প্রায় ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে জুন থেকে সে অবস্থা কাটিয়ে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। নতুন করে আবারও রপ্তানি শুরু হওয়ায় নতুন অর্থবছরে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন রপ্তানিকারকরা।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফইএ) সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া হিমায়িত চিংড়ির ৮৫ ভাগ রপ্তানি হয় ইউরোপে। বাকি ১৫ ভাগ চিংড়ি রপ্তানি হয় আমেরিকা ও জাপানসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রায় আয় হয়েছিল ৪ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। তবে ইউরোপসহ বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার কারণে গত মার্চ থেকে বাংলাদেশের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি প্রায় ৭০ শতাংশ বন্ধ হয়ে যায়। এতে চলতি অর্থবছরে কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন নিয়ে আশঙ্কা দেখা দেয়।
বিএফএফইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুল বাকী বলেন, করোনার কারণে চিংড়ির ভরা মৌসুম (পিক সিজন) মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত আমরা হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করতে পারিনি। ফলে প্রচুর লোকসান দিতে হয়েছে। জুন থেকে পুনরায় রপ্তানি শুরু হলেও বিশ্ব বাজারে চিংড়ির দাম কম পাওয়া যাচ্ছে। তাতে আমাদের লাভ হচ্ছে না। কিছু লোকসান দিয়েও ব্যবসায় টিকে থাকতে হচ্ছে। সামনে গলদা চিংড়ির মৌসুম। এই মৌসুমে আমরা লাভ করতে পারব বলে আশা করছি। এখন আমরা চাষিদেরও ভালো দাম দিতে পারছি না। অভ্যন্তরীণ বাজারেও তারা ভালো দাম পাচ্ছেন না। ফলে তারাও বিপদগ্রস্ত।
খুলনা মত্স্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা এ টি এম তৌফিক মাহমুদ জানান, করোনার কারণে বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত থাকার পর ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে খুলনা অঞ্চল থেকে হিমায়িত চিংড়িসহ মাছ রপ্তানি শুরু হয়েছে। এ মাসে চিংড়িসহ সাদা মাছ রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৪৭৯ টন। এ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ২ কোটি ৪১ লাখ ১৪ হাজার মার্কিন ডলার। অর্থাত্ ১৯৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে চিংড়ির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪৫২ দশমিক ৬০ টন। যার মূল্য প্রায় ২ কোটি ৩৬ লাখ ৭৪ হাজার ৪০০ ডলার। খুলনা অঞ্চল থেকে রপ্তানিকৃত হিমায়িত মাছের মধ্যে চিংড়ির পরিমাণ প্রায় ৯৫ শতাংশ। বাকি ৫ শতাংশ সাদা মাছ, কাঁকড়া, কুঁচে ইত্যাদি। সর্বশেষ ২০২০ সালের জুলাই মাসে চিংড়িসহ হিমায়িত মাছ রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৯০৫ টন। এ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ২০১ কোটি টাকা।
তিনি জানান, করোনার দুর্যোগ বার্ষিক রপ্তানিতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। ২০১৯-২০ সালে হিমায়িত চিংড়িসহ মাছ রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৯ হাজার ৫৪১ টন। যা থেকে আয় হয়েছে ২ হাজার ৩৫৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ সালে রপ্তানি হয় ২৯ হাজার ৭ টন। এ থেকে আয় হয় ২ হাজার ২৯০ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০১৭-১৮ সালে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৯ হাজার ২০১ টন। এ থেকে আয় হয় ২ হাজার ৪৮৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
এ ব্যাপারে মত্স্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ, খুলনার উপপরিচালক মোহা. মজিনুর রহমান বলেন, কোভিড-১৯ সংক্রমণ শুরু হলে জানুয়ারি মাস থেকে ইউরোপ-আমেরিকার আমদানিকারকদের সঙ্গে আমাদের রপ্তানিকারকদের চুক্তি বাতিল অথবা স্থগিত হয়ে যায়। ফলে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত চিংড়ি রপ্তানি খুব কম হয়েছে। তবে করোনার প্রভাব কমে যাওয়ায় জুন থেকে রপ্তানি আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। দীর্ঘ ৪ মাস প্রায় বন্ধ থাকায় আমরা আড়াই থেকে ৩ হাজার টন চিংড়ি রপ্তানি করতে পারিনি। তবে এ বছর থেকে চিংড়ি রপ্তানি বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।
