সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে জানাই তাঁর প্রতি অসীম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। এই মহামানবের স্মৃতি চির অম্লান। তিনি এমনভাবে আমাদের জীবনে-কর্মে-হূদয়ে স্থান করে নিয়েছেন, যেন মনে হয় আমাদের মাঝেই আছেন। যুগ যুগ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁকে শ্রদ্ধায় আর ভালোবাসায় স্মরণ করবে। তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা থেকে পাঠ নেবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে যে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবোধ এবং পৃথক জাতিসত্তা রয়েছে, জনগণ ও দলীয় সহকর্মীদের সাথে নিয়ে তিনি তা দীর্ঘদিনের লড়াই-সংগ্রাম, জেল-জুলুম, মেধা-পরিশ্রম দিয়ে তিল তিল করে বিকশিত করেছিলেন। তিনি এই রাষ্ট্রের স্থপতিও। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে নতুনভাবে রাষ্ট্র গড়ে তুলতে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান, আইন নেই যা তিনি সৃষ্টি করে যাননি। ইতিহাসে প্রথম বহু আকাঙ্ক্ষিত জাতীয় চার নীতির ওপর ভিত্তি করে তিনি সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন।
তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ বক্তা, অত্যন্ত মেধাবী রাজনীতিবিদ (‘poet of politics’) এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক, যাঁকে একনামে বিশ্ববাসী চিনত। বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পরিচয় ছিল শেখ মুজিবুরের দেশ হিসেবে। ইউনেস্কো (UNESCO) ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে দেওয়া বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণটিকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আজকে বঙ্গবন্ধুর স্থান—বিশ্বে সেই জর্জ ওয়াশিংটন যেমন জাতির পিতা যুক্তরাষ্ট্রের, মহাত্মা গান্ধী যেমন ভারতের, সুকর্ণ যেমন ইন্দোনেশিয়ার, হো চি মিন যেমন ভিয়েতনামের, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তেমনি বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশেরই নন, সারা পৃথিবীর একজন অনন্য নেতা, একজন বরেণ্য নেতা। তাঁর প্রতি সম্মান দেখানো, তাঁকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা মানে আমাদের নিজেদেরকে গৌরবান্বিত করা। তাঁকে জানা মানেই বাঙালি জাতিকে জানা, ইতিহাসকে জানা, বাঙালি জাতির ঐতিহ্যকে জানা। কারণ এসবই তিনি লালন করেছেন সারা জীবন, এগুলো নিয়েই তিনি কাজ করেছেন এবং এরই ফলশ্রুতিতে বাঙালি জাতির এই জন্মভূমি, স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে।
বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য, জাতিকে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড় করাবার জন্য যিনি জেল-জুলুম-ফাঁসির দড়ি পরোয়া করেন নাই, এমন একজন মহান ও অবিসংবাদিত নেতাকে কেউ নির্মমভাবে হত্যা করতে পারে এটি অকল্পনীয়। একই সাথে নেতার সবচাইতে প্রিয়জন; তাঁর আজীবন সঙ্গিনী, আমাদের প্রেরণা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব; জ্যেষ্ঠপুত্র, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক জগতের সফল সংগঠক শেখ কামাল; মুক্তিযোদ্ধা ও যুক্তরাজ্যের স্যান্ডহার্স্ট গ্র্রাজুয়েট লে. শেখ জামাল; পুত্রবধুদ্বয়; শিশু রাসেল; একমাত্র ভাই শেখ নাসের, ভগ্নিপতি ও মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাদ, তাঁর স্ত্রী-পুত্র-কন্যা; ভাগ্নে শেখ ফজলুুল হক মনি ও তাঁর স্ত্রীসহ আরো অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে সেদিন রক্তের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। কেন কিসের জন্য এই নির্মম হত্যাকাণ্ড? কারা এই ঘাতক? কী তাদের উদ্দেশ্য? বঙ্গবন্ধুকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসা কর্নেল জামিলও শহিদ হন। সকল শহিদদের প্রতি আমরা জানাই সশ্রদ্ধ সালাম। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রার্থনা করি তাঁদের যেন বেহেস্ত নসিব করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই কাল রাতের কথা; সেই অন্ধকার ভোরের কথা প্রতিনিয়ত স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে। ঠিক তার আগের রাতে ১৪ আগস্ট বোধ হয় প্রায় ১১টার সময় আমি ৩২ নম্বরে (বঙ্গবন্ধু ভবন) তাঁর সঙ্গে দেখা করে নির্দেশ নিয়ে এসেছিলাম। পরদিন ১৫ আগস্ট সকাল বেলা তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সেজন্য ছিল চারদিকে সাজ সাজ রব, কীভাবে অভ্যর্থনা জানানো হবে, নিরাপত্তার কী ব্যবস্থা হবে ইত্যাদি। কিন্তু তখন কেউ চিন্তাই করতে পারেনি যে, আমাদের ঘরের শত্রু বিভীষণরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকে রাইফেল তাক করে আছে, টার্গেট করে আছে তাঁর হূদয়ের দিকে; কেমন করে তাঁকে এই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে সেই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। অবশ্য ১৪ আগস্টের আগেও মাঝে মাঝে শোনা যেত নানা রকম কথা। বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা বোধহয় বিঘ্নিত হচ্ছে, যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না ইত্যাদি। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই সময়টায় এবং তার আগেও দেখেছি, বিভিন্ন সময় যখনই নিরাপত্তার কথা উঠত, বঙ্গবন্ধু দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে সহজ ও সবলভাবে আমাদের বলতেন, ‘কোন খাঁটি বাঙালী কখনই আমাকে হত্যা করতে পারে না ’।
কথাটি কিন্তু তিনি ঠিকই বলেছিলেন। কোনো প্রকৃত বাঙালি তাঁকে হত্যা করেনি। তাঁর বুকের দিকে রাইফেল কিংবা মেশিনগান তাক করেনি। হত্যাকারীরা, সেই মার্ডারারগুলো, সেই নরকীটগুলো, সবাই ছিল বিদেশের চর, সব পাকিস্তানি এবং অন্য বিভিন্ন দেশের চর। এরা বাঙালি নয়, নরাধম। তারা মুক্তিযুদ্ধের শত্রু, বাঙালির শত্রু, বাংলাদেশের শত্রু।
১৫ আগস্ট সকালে বেতারে মেজর ডালিমের চরম ঔদ্ধত্বপূর্ণ ঘোষণা শোনার পর আমি প্রথমে টেলিফোন করলাম সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবকে। সাথে সাথে তিনি ধরলেন এবং বললেন, ‘তওফিক আমিও শুনেছি, ঘটনাতো মনে হয় সত্য। এখন কি করা যায়।’ আমি বললাম, ‘আপনি নির্দেশ দিন, আপনি তো উপ-রাষ্ট্রপতি।’ তিনি বললেন, ‘আমি চিন্তা করে দেখি।’ তার পরেই আমি তাজউদ্দীন আহমদ সাহেবকে টেলিফোন করলাম, তারপর মনসুর আলী সাহেবকে, কামরুজ্জামান সাহেবকে। এঁরা সকলেই যেমন স্তম্ভিত তেমনি হতভম্ব হয়ে গেছেন এবং প্রত্যেকের কণ্ঠেই কান্নার সুর, কেউ প্রকাশ্যে কাঁদতে পারছেন না; অথচ বুক ফেটে কান্না চলে আসছে। এমন একটি অবস্থায় প্রচণ্ড যন্ত্রণার মধ্যে থাকতে থাকতেই বিভিন্ন জায়গা থেকে খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করলাম। খুনিদের নামগুলো জানতে পারলাম। আমার মনে হচ্ছিল, এরা আমাদেরও হত্যা করবে, কারণ তারা তো জানে আমরা বঙ্গবন্ধুর কতখানি কাছের এবং কে কী করছিলাম।
১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্রুত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুকে নৃশংস হত্যার পূর্বে বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুনর্গঠিত ও পুনর্বাসিত হয়ে অতি দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছিল। দেশ শত্রুমুক্ত হবার সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১,৩০০ (এক হাজার তিনশত) কোটি টাকা। কৃষি এবং ভৌত অবকাঠামো ছিল সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। নিহত, আহত ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা, তাঁদের পরিবার, কয়েক লক্ষ লাঞ্ছিত মা-বোনেরা সবাই তাকিয়ে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর দিকে। তিনি তাদের নিরাশ করেননি। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিত্সা, কৃষি পুনর্বাসন, শিক্ষা—প্রতিটি ক্ষেত্রে দৃষ্টি দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের যথাসাধ্য উন্নতি সাধন করেছিলেন।
চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরসহ দেশের বড়ো বড়ো ব্রিজ, জাহাজ, রেলওয়ে এবং প্রধান সড়কসমূহ পুনর্নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এসব উন্নয়ন পরিকল্পিতভাবে করার জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩-১৯৭৮ প্রথম পঞ্চ-বার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্বিমুখী : পুনর্বাসন এবং বিনিয়োগ; যাতে দ্রুত দারিদ্র্য নিরসন করা যায়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু কৃষিক্ষেত্রে সকল উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন করেন এবং সেই সাথে কয়েকটি নতুন প্রতিষ্ঠানও স্থাপন করেন। পাশাপাশি শিক্ষার দিকে দৃষ্টি দিয়ে প্রথমে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন এবং পরে ২৬,০০০ (ছাব্বিশ হাজার) প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। ১৯৭৫-এ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৭.০০ শতাংশে পৌঁছাতে পেরেছিল। যা তারপর জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার ছাড়া আর কোনো সরকার পারেননি। ৭৫ পর্যন্ত বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে যাত্রা শুরু করেছিল। পরে পাকিস্তানপন্থি সরকারগুলো (খন্দকার মোশতাক, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া) অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে প্রায় ভিক্ষুকের জাতিতে পরিণত করে। কতিপয় ব্যক্তিকে রাষ্ট্র সহায়তা করে একটি নব্য ধনীগোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয় এবং রাজনীতিতে সুযোগসন্ধানী-সুবিধাবাদীদের আমদানি করা হয়। রাজনৈতিক দিক থেকে এটিই ছিল সবচাইতে কালো অধ্যায়। বাংলাদেশকে সবাই চিনত সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে। রাজনীতি ছিল হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের।
১৯৮১ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর জননেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশের জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে স্বাধীনতার স্বপক্ষের সকল শক্তিকে একত্রিত করে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুদীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আবারও আসীন হয়। শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কর্মযজ্ঞ। পরবর্তী সময়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ‘দিন বদলের সনদ’-কে সামনে রেখে জনগণের রায় নিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় আসে। শুরু হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ।
যদি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন তাহলে ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা বাংলাদেশ অনেক আগেই উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতো। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে পিছিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশকে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুকন্যা, আমাদের প্রিয় নেত্রী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার দিকে ধাবমান। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁর আদর্শের আলোকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’
লেখক :মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা
