পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে আজ অবধি যুগে যুগে এমন সব ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটেছে, যাঁদের হাত ধরে মানবতার মুক্তির সনদ রচিত হয়েছে। বাংলাদেশ নামক আমাদের এই ছোট্ট ভূখণ্ডটিতেও এমন একজন ক্ষণজন্মা পুরুষের জন্ম হয়েছিল, যাঁর কল্যাণে রচিত হয়েছিল আমাদের মুক্তির সনদ। তিনি হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গোপালগঞ্জ জেলার মধুমতি নদীর তীরবর্তী টুঙ্গিপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে যাঁর জন্ম।
ছাত্রজীবন থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন রাজনীতি-সচেতন মানুষ। রাজনীতি যেন তাঁর রক্তে মিশে আছে। তিনি উপলব্ধি করতেন যে, রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমেই বৃহত্ কল্যাণ সম্ভব। তাই তো এদেশের সকল রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি সবসময় অগ্রভাগে ছিলেন। গোপালগঞ্জ মিশন হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের জন্য সাত দিন কারাভোগ করেন।
শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন গণমানুষের নেতা। তিনি যেমন নিঃস্বার্থভাবে জনকল্যাণের রাজনীতি করতেন তেমনি জনগণের ভালোবাসাও পেয়েছেন। তাঁর মুক্তির দাবিতে রাজপথে বিশাল মিছিল, ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ-অনশন তারই প্রমাণ। তিনি ছিলেন জনগণের বন্ধু। এর স্বীকৃতিস্বরূপ তত্কালীন ঢাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এই উপাধিটি যে কেবল তাঁর জন্যই যথাযথ ছিল তার প্রমাণ হলো পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুই তাঁর নাম হয়ে যাওয়া।
৭ মার্চ, বাঙালি জাতির নতুন দিগন্তের সূচনার এক ঐতিহাসিক দিন। এদিন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির ভবিষ্যত্ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। তবু এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকার পর অবশেষে বাংলাদেশে পদার্পণ করেন বাঙালির প্রাণের স্পন্দন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। লাখো মানুষের ঢল বেয়ে মহান নেতা আসলেন চিরচেনা সেই রেসকোর্স ময়দানে। দিলেন দেশ গড়ার দিকনির্দেশনা। ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সহযোগিতা চেয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এমন এক শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যেখানে সবাই সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে। আর এজন্য জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী ও রসিক মানুষ। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক সভায়ও সমানভাবে সমাদৃত ছিলেন। তিনিই প্রথম ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন। তিনি ১৯৭২ সালে বিশ্বশান্তি পরিষদের দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘জুলিও কুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।
বাংলার ইতিহাসে জঘন্যতম দিন ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। যাঁর অঙ্গুলিহেলনে কোটি মানুষ প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই মহামানবকে কতিপয় নরপিশাচ সপরিবারে হত্যা করে বাংলার মাটিকে কলঙ্কিত করে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার কতিপয় মানুষ নামের জানোয়ার পিতৃহত্যার মতো ঘৃণ্য কাজের মাধ্যমে তাঁর স্বপ্নকে বিলীন করতে চেয়েছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি। কারণ তাঁর স্বপ্নসারথিরা আজও জেগে আছে।
লেখক :শিক্ষার্থী, আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
