যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র

সংঘর্ষ নয়, তিন কিশোরকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২০, ২২:১৭

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন কিশোর বন্দি খুনের ঘটনা দুই গ্রুপের সংঘাত নয়, কর্মকর্তারা ঠান্ডা মাথায় পিটিয়ে এই হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে প্রাথমিক সত্যতা পেলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি। তবে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে চিকিত্সাধীন আহত কিশোররা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ                দিয়েছে।  বৃহস্পতিবারের ঐ ঘটনায় যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কর্মকর্তা ও আনসার সদস্যদের অমানুষিক নির্যাতন ও মারপিটে তিন কিশোর নিহত এবং আরো অন্তত ১৪ জন আহত হয়। দুপুরে এ ঘটনা ঘটলেও সন্ধ্যায় লাশ হাসপাতালে আনার পর ঘটনা জানাজানি হয়। প্রথমে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা এটিকে দুই পক্ষের সংঘর্ষ বলে দাবি করলেও পরবর্তীতে নির্যাতনের বিষয়টি সামনে আসে।

এ ঘটনায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ঐ কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। তিনি ছাড়াও সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলর মুশফিকুর রহমানসহ ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ঘটনা তদন্তে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ ঘটনায় নিহত কিশোর পারভেজ হাসান রাব্বির বাবা খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশা পশ্চিম সেনপাড়ার রোকা মিয়া বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এতে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়েছে।

ঐ ঘটনায় নিহতরা হলো—বগুড়ার শিবগঞ্জের তালিবপুর পূর্বপাড়ার নান্নু পরমানিকের ছেলে নাঈম হোসেন (১৭), একই জেলার শেরপুর উপজেলার মহিপুর গ্রামের নুরুল ইসলাম নুরুর ছেলে রাসেল ওরফে সুজন (১৮) এবং খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশা পশ্চিম সেনপাড়ার রোকা মিয়ার ছেলে পারভেজ হাসান রাব্বি (১৮)। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল শুক্রবার তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নাঈম হোসেন ধর্ষণ এবং রাব্বি হত্যা মামলার আসামি ছিল।

জানতে চাইলে যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, ‘কীভাবে এই কিশোররা হতাহত হলো তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তের পরই পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে।’ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, ‘দুই পক্ষের বক্তব্যে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত যে সংঘর্ষ নয়, মারপিটেই তিন জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়েছে। কেন্দ্রের মধ্যে কেউ অপরাধ করলে, সেখানে অভ্যন্তরীণ শাস্তির রেওয়াজ আছে। সেটি করতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটতে পারে। বিষয়টি আমরা যাচাই-বাছাই করছি।’

এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে বের হয়ে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি এ কে এম নাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আসলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। ঘটনাটি একপক্ষীয়। যারা আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিত্সাধীন, তারাই এই ঘটনার মূল সাক্ষী। তাদের কথার সত্যতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে।’

নির্যাতনের বর্ণনা দিল আহতরা :বৃহস্পতিবার রাতে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি বন্দি কিশোররা তুলে ধরে তাদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা। তারা জানায়, ঈদের দুই দিন পর ৩ আগস্ট শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের আনসার সদস্য নূর ইসলাম কয়েক জন কিশোরের চুল কেটে দিতে চান। কিন্তু কিশোররা চুল কাটতে রাজি না হওয়ায় তিনি কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেন, ঐ কিশোররা নেশা করে। এই ঘটনায় ঐ দিন কয়েক জন কিশোরকে মারপিট করা হয়।

আহত কিশোরদের দাবি, ঐ ঘটনার সূত্র ধরে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে ১৮ জন বন্দিকে রুম থেকে বাইরে বের করে আনা হয়। এরপর বিকাল ৩টা পর্যন্ত পালাক্রমে তাদের লাঠিসোঁটা, রড ইত্যাদি দিয়ে বেধড়ক মারপিট করা হয়। পালাক্রমে এভাবে মারপিটের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের ফেলে রাখা হয়। পরে কয়েক জন মারা গেলে সন্ধ্যার দিকে তাদের লাশ যশোর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিত্সাধীন বন্দি চুয়াডাঙ্গার পাভেল জানায়, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, প্রবেশন অফিসার মুশফিকসহ অন্য স্যাররাও মারপিটে অংশ নেন। আহত আরেক কিশোর নোয়াখালীর বন্দি জাবেদ হোসেন জানায়, স্যাররা ও অন্য বন্দি কিশোররা আমাদের লোহার পাইপ, বাটাম দিয়ে কুকুরের মতো মেরেছে। তারা জানালার গ্রিলের ভেতর আমাদের হাত ঢুকিয়ে তা বেঁধে মুখের ভেতর কাপড় দিয়ে এবং পা বেঁধে মারধর করে। অচেতন হয়ে গেলে আমাদের কাউকে রুমের ভেতর আবার কাউকে বাইরে গাছতলায় ফেলে আসে। জ্ঞান ফিরলে ফের একই কায়দায় পিটিয়েছে।

যশোরের বসুন্দিয়া এলাকার বন্দি ঈষাণ জানায়, নিহত রাসেল আর আমি একই রুমে থাকতাম। আগামী মাসেই তার জামিনে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। স্যারদের বেদম মারপিটে আহত হয়ে চিকিত্সা না পেয়ে সে মারা গেছে। তার অভিযোগ, প্রবেশন অফিসার মারধরের সময় বলেন, তোদের বেশি বাড় বেড়েছে। জেল পলাতক হিসেবে তোদের বিরুদ্ধে মামলা করে ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে।

আহতরা আরো জানায়, মারধর করে তাদের এখানে সেখানে ফেলে রাখা হয়। পরে একজন করে মারা গেলে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে ১১টার মধ্যে চার দফায় আহতদের হাসপাতালে আনা হয়। যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিত্সক অমিয় দাস বলেন, ‘দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি মরদেহ আসে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে। একজনের মাথায় ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। অন্যদের শরীরের আঘাতের কোনো চিহ্ন এখনও শনাক্ত হয়নি।’

এর আগে কেন্দ্রের প্রশিক্ষক মুশফিক দাবি করেন, কয়েক দিন আগে সংশোধনাগারে শিশুদের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েক জন আহত হয়। ঐ ঘটনার জেরে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর আবার সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে নাইম, রাব্বি ও রাসেল হোসেন গুরুতর আহত হয়। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিত্সক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। কেন্দ্রের সহকারী পরিচারক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ দাবি করেন, সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছে।